মিজান খানঃ পুরান ঢাকার লালবাগ-চকবাজার-বংশাল থানার ১৩টি ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-৭ আসনেও লেগেছে জাতীয় নির্এবাচনের ঢেঊ। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ গেল নির্বাচনে নৌকা হেরে গেলেও, ওই নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হাজি সেলিম এখন অসুস্থ। অপরদিকে, প্রয়াত নাসির উদ্দিন পিন্টু এক সময়ে এ আসনে বিএনপির রাজনীতি এক হাতে নিয়ন্ত্রণ করলেও, তার মৃত্যুর পর একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন পেতে মরীয়া বিএনপিতে। ফলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন চমকের অপেক্ষায় এলাকাবাসী।
প্রায় ৩ লাখ ভোটারের এ আসনে মূল সমস্যা জ্বলাবদ্ধতা। পাশাপাশি যানজট, বিশুদ্ধ পানির অভাব, গ্যাসের সমস্যা। প্রতিদিন চকের পাইকারীবাজারে সারাদেশ থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আসায় যানজটের ভয়াবহতা দিনে দিন বেড়েই চলছে। ভোটারদের দাবি, এখানে এমন প্রার্থী দরকার, যিনি যানজটমুক্ত এলাকা, জলাবদ্ধতা ও রাস্তা-ঘাটসহ সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন করতে পারবে। পাল্টে দিতে পারবে এলাকার চেহারা। তারা আরো বলেন, এখানে লড়াই হবে নৌকা ও ধানের শীষে। বড় দল ভোটে না এলে ভোটের আনন্দ থাকে না। দুই দলেই যোগ্যপ্রার্থী আছে, কে জিতবে তা বলা কঠিন বলে জানান এলাকাবাসী।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগের হাজী মোহাম্মদ সেলিম। ২০০১ সালে হাজী সেলিমকে হারিয়ে এমপি হন বিএনপির প্রয়াত নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু। আবার ২০০৮ সালে নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টুকে পরাজিত করে এমপি হন আওয়ামী লীগের মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। সবশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনে ৪২ হাজার ৭শ’ ২৮ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীপ্রার্থী হাজী মোহাম্মদ সেলিম, দলের মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে হারিয়ে স্বতন্ত্র এমপি হন।

জানা গেছে, জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা হাজী সেলিম বর্তমানে অসুস্থ। জনগণের সঙ্গে একটা দূরত্বও তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে শাসক দলের মনোনয়নের আশায় দৌড়ঝাঁপ করছেন দলের একাধিক প্রার্থী। আর তারা হলেন- সাবেক এমপি ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, দক্ষিণ আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আখতার হোসেন, মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হুমায়ন কবির, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিক। এদিকে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হুমায়ন কবীরও প্রার্থী দৌড়ে লড়ছেন।

উদীয়মান প্রার্থী হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন আখতার হোসেন। তিনি বৃহত্তর ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন গতবার। দল তরুণ ও শিক্ষিত প্রার্থী বাছাই করলে, আখতার হোসেনের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আখতার হোসেন বলেন, দেশজুড়ে উন্নয়নের জোয়ার বইছে। এখানে নেতৃত্ব দূর্বলতায় কাঙ্খিত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। এখানে যদি ডায়নামিক কোনো লিডার থাকত, তাহলে সারাদেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নয়ন হত এখানেও। সে কারণে এখানে আমরা কিছুটা বঞ্চিত। এ আসনের সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান হয়নি। তাই এলাকার মানুষকে সেই সেবাগুলো দিতে আমি প্রার্থী হতে চাই। গতবারও তিনি দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন।

দলের মধ্যে কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব আছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো দ্বন্দ্ব নেই। দল ঐক্যবদ্ধ। নেত্রী যাকে মনোনয়ন দেবেন, সবাই তার হয়েই কাজ করবেন। এখানে দলীয় কোনো কোন্দোল থাকবে না। আমার কাছে দলীয় কোন্দল প্রাধান্য পাবে না। কোন্দল থেকে থাকলেও তা মিটিয়ে সবাইকে নিয়ে আমি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব। তিনি আরো বলেন, কোনোভাবেই নৌকার বাইরে গিয়ে রাজনীতি করার ইচ্ছা নাই। যদি ইচ্ছা থাকত, তাহলে আগেই করতে পারতাম। নৌকার সঙ্গে ছিলাম, আছি, শেষ পর্যন্ত থাকব।’

এ আসনে বিএনপির অবস্থান ভালো নয়। কারণ জনবান্ধব কোনো কর্মসূচি নেই বড় এই দলের। মানুষের সঙ্গে দূরত্বও তৈরি হয়েছে। তাই নেতাকর্মীদের মধ্যে নেই তেমন কোনো নির্বাচনী উত্তাপ। জেল, জুলুম, গুপ্তহত্যাসহ হামলা-মামলার ভয়ে নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে নারাজ তারা। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা প্রকাশ্য প্রস্তুতি না নিলেও, গোপনে নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলছেন। এখানে ধানের শীষের মনোনয়ন চাইবেন প্রয়াত নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর স্ত্রী ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ-সভাপতি নাসিমা আক্তার কল্পনা। এছাড়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহ-সভাপতি মোশারফ হোসেন খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রাসেল, যুবদল নেতা মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ ও ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকারও মনোনয়ন দৌড়ে আছেন।এছাড়া বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন ব্যবসায়ী নেতা আবু মোতালেব। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহ-সভাপতি মোতালেব ১৯৮৩-৮৪ সালে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ শাখার ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৯২-৯৬ মেয়াদে বৃহত্তর লালবাগ থানার যুগ্ম-সম্পাদক ও পরে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। এদিকে মনোনয়ন পেতে কাজ করে যাচ্ছেন বিএনপি নেতা মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ। ছাত্রদলের সহ-সভাপতি, ঢাকা কলেজের ভিপি, যুবদলের ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক, যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা এই নেতা বর্তমানে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-যুববিষয়ক সম্পাদক। তার বড় ভাই মীর আশরাফ আলী আজম ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা, আরেক ভাই মীর শরাফত আলী সফু বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক।

এই আসনে তেমন কোনো আলোচনায় নেই এরশাদের জাতীয় পার্টি। নেই কোনো কর্মকাণ্ড। তবে দলীয়ভাবে নির্বাচন হলে ঢাকা-৭ আসনে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন প্রার্থী হবেন। তিনিও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। দলেও রয়েছে তার প্রভাব।
এখানে জোট বা দলীয় যেভাবেই হোক নির্বাচন, লড়াই হবে দ্বিমুখী। ভোটের ব্যবধান গড়ে অন্যরা থাকবেন তলানিতে। নৌকা-ধানের শীষ থেকে বেরিয়ে আসবে আগামী দিনের এমপি।