০২:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪

রোহিঙ্গা সংকট ও জাতিসংঘে মিয়ানমার সম্পর্কে ‘ক্ষোভ’

নিজস্ব সংবাদ দাতা
  • আপডেট সময় ১১:১২:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৩
  • / ৪৯ বার পড়া হয়েছে

রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে সংকট বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাচ্ছে। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত মিয়ানমারের জন্য আর অর্থ ব্যয় না করে সেই অর্থ বাংলাদেশের শরণার্থীদের দিতে বলেছেন জাপানকে।

এদিকে এএফপির এক খবরে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ওপর জাপানকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত টমাস অ্যান্ড্রুস। তিনি বলেছেন, ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে জাপান রাশিয়ার ওপর যেমন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তেমন করেই তাদের মিয়ানমারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া উচিত। তিনি মিয়ানমারের সেনাদের নিয়ে জাপানের একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি জাপানের সমালোচনা করে বলেন, তারা জাপানের সহায়তায় কমব্যাট প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং শিখছে কী করে দক্ষ সৈনিক ও কমান্ডার হওয়া যায়। এবং তারা সেই সেনাবাহিনীতে ফিরবে, যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধে দায়ী। যতদিন জাপান এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ না করবে, ততদিন তারা বর্বর সামরিক শাসনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে জাপানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। অভ্যুত্থানের আগে জাপান ছিল তাদের অন্যতম প্রধান সহায়তা প্রদানকারী ও সেইসাথে বিনিয়োগের উৎস। এইসব সহায়তা তিনি বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য নতুন খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে ব্যয় করার পরামর্শ দিয়েছেন জাপানকে।

জাতিসংঘের এই বিশেষ দূত টোকিওতে এমন এক সময়ে এইসব কথা বললেন যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর মাত্র শেষ করেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার সঙ্গে বৈঠকেও রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। বুধবার ওই বৈঠকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও জাপান তাদের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করেছে। বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় এক মিলিয়ন বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিকে আশ্রয় দিয়েছে এবং আমরা তার প্রচেষ্টাকে সমর্থনদান অব্যাহত রাখবো।

জাতিসংঘের হিসেবে বাংলাদেশে এখন প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে। তাদের জন্য চলতি বছরে প্রয়োজন ২৮৫.১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে চাহিদার মাত্র ১৮ ভাগ। আর কয়েক বছর ধরেই চাহিদার ৬০-৭০ ভাগের বেশি সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) বলছে, ২০২২ সালে ২৮৫.১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ২০০ মিলিয়ন ডলার। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এখন ডোনারদের চোখ ইউরোপের শরণার্থীদের দিকে। এদিকে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দিতে ব্যয় করেছে ১০০ কোটি টাকা। ২ হাজার ৩১২ টাকা খরচ করেছে ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণে। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিপুল জনশক্তি নিয়োগ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে নিজস্ব অর্থায়নে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ ইয়াবা প্রবেশ করে মিয়ানমার সীমান্ত হয়ে। ইয়াবার চালানের ৭০ শতাংশই মজুত করা হয় রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে। এরপর সেখান থেকে তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে। ২০২২ সালে রোহিঙ্গা শিবিরে অন্তত ২৫ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। ওই সময়ে বিভিন্ন অপরাধের কারণে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির থেকে অন্তত এক হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে নানা গ্রুপে সংঘাত ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গারা প্রায়ই শিবির ছেড়ে বের হয়ে আসছেন। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছে কাঠের তৈরি নৌকায় করে। সম্প্রতি এই প্রবণতা আরো বেড়েছে। জাতিসংঘের হিসাব বলছে, ২০২১ সালে যেখানে মাত্র ৫০০ রোহিঙ্গা সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, ২০২২ সালে সেই সংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার ৪০০ জন। বেআইনিভাবে বাংলাদেশের এনআইডি এবং পাসপোর্ট নেয়ারও অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে কক্সবাজারের সাড়ে তিন হাজার একর বনভূমি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, যা কক্সবাজারের মোট বনাঞ্চলের ১.৬৭ শতাংশ। রোহিঙ্গাদের জ্বালানির চাহিদা মেটানোর জন্য বিপুল পরিমাণ গাছ কাটতে হচ্ছে, যা স্থানীয় জীব-বৈচিত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নিয়মিত ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে, নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এইসব পরিস্থিতি কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে রোহিঙ্গা বিরোধী মনোভাব বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের কোণঠাসা মনে করছেন।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে রোহিঙ্গা বিষয়টি এসেছে। জাপান আর্থিক এবং প্রত্যাবসনে সহায়তার কথা বলেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ফোরামে বিষয়গুলো তুললেও পরবর্তীতে কূটনৈতিক ফলোআপে ধারাবাহিকতা থাকে না। তার কথা, জাপানের মতো মিয়ানমারের আরো যেসব বন্ধু রাষ্ট্র আছে, তাদের নিয়ে আমাদের সরকারকে কাজ করতে হবে। তাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগে যুক্ত করতে হবে। জাপান পারে আসিয়ানে বিষয়টি তুলতে। এখন সেটা আমাদের দিক থেকে করতে হবে। আমাদের তৎপরতার ওপর নির্ভর করছে বিশ্ব কতটা এগিয়ে আসে। ওইভাবে স্যাংশন তো হবে না। তাই মিয়ানমারকে চাপে রাখতে আমাদের সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেয়া দরকার। মিয়ানমারে সামরিক শাসন চলছে। তাই হয়তো প্রত্যাবাসন কঠিন হবে। কিন্তু তারপরও আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, সামনে নির্বাচন। এই সময়ে হয়ত রোহিঙ্গা ইস্যুটি সরকার অতটা গুরুত্ব দেবে না। যদি এটা হয় তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মনে করতে পারে বিষয়টিকে আমরা এখন আর ততটা গুরুত্ব দিচ্ছি না- এমন যেন না হয়। আর সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং কূটনীতিক মো. হুমায়ুন কবির মনে করেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়াই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের একমাত্র পথ। কিন্তু সেটা এগোচ্ছে না। প্রত্যাবাসন যত দেরি হবে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের ভিতরে সংকট ততই বাড়বে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। জাপান বাংলাদেশকে সহায়তার কথা বলেছে। কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক ভালো। তারা সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। অর্থ সহায়তা বা অন্য কোনো ধরনের সহায়তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার উদ্যোগে সহায়তা করা। জাপান চাইলে এটা ত্বরান্বিত হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান স্পষ্ট নয়।

তার কথা, চীন এই সময়ে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক। সেটা সফল হলেও রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া শুরু হবে। আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে। ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র তারাও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কিছু বলছে না। তিনি মনে করেন, মিয়ানমারকে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ফেলতে না পারলে আসলে এই সমস্যার সমাধান কঠিন হবে।

ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

রোহিঙ্গা সংকট ও জাতিসংঘে মিয়ানমার সম্পর্কে ‘ক্ষোভ’

আপডেট সময় ১১:১২:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৩

রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে সংকট বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাচ্ছে। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত মিয়ানমারের জন্য আর অর্থ ব্যয় না করে সেই অর্থ বাংলাদেশের শরণার্থীদের দিতে বলেছেন জাপানকে।

এদিকে এএফপির এক খবরে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ওপর জাপানকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত টমাস অ্যান্ড্রুস। তিনি বলেছেন, ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে জাপান রাশিয়ার ওপর যেমন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তেমন করেই তাদের মিয়ানমারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া উচিত। তিনি মিয়ানমারের সেনাদের নিয়ে জাপানের একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি জাপানের সমালোচনা করে বলেন, তারা জাপানের সহায়তায় কমব্যাট প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং শিখছে কী করে দক্ষ সৈনিক ও কমান্ডার হওয়া যায়। এবং তারা সেই সেনাবাহিনীতে ফিরবে, যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধে দায়ী। যতদিন জাপান এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ না করবে, ততদিন তারা বর্বর সামরিক শাসনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে জাপানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। অভ্যুত্থানের আগে জাপান ছিল তাদের অন্যতম প্রধান সহায়তা প্রদানকারী ও সেইসাথে বিনিয়োগের উৎস। এইসব সহায়তা তিনি বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য নতুন খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে ব্যয় করার পরামর্শ দিয়েছেন জাপানকে।

জাতিসংঘের এই বিশেষ দূত টোকিওতে এমন এক সময়ে এইসব কথা বললেন যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর মাত্র শেষ করেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার সঙ্গে বৈঠকেও রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। বুধবার ওই বৈঠকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও জাপান তাদের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করেছে। বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় এক মিলিয়ন বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিকে আশ্রয় দিয়েছে এবং আমরা তার প্রচেষ্টাকে সমর্থনদান অব্যাহত রাখবো।

জাতিসংঘের হিসেবে বাংলাদেশে এখন প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে। তাদের জন্য চলতি বছরে প্রয়োজন ২৮৫.১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে চাহিদার মাত্র ১৮ ভাগ। আর কয়েক বছর ধরেই চাহিদার ৬০-৭০ ভাগের বেশি সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) বলছে, ২০২২ সালে ২৮৫.১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ২০০ মিলিয়ন ডলার। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এখন ডোনারদের চোখ ইউরোপের শরণার্থীদের দিকে। এদিকে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দিতে ব্যয় করেছে ১০০ কোটি টাকা। ২ হাজার ৩১২ টাকা খরচ করেছে ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণে। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিপুল জনশক্তি নিয়োগ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে নিজস্ব অর্থায়নে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ ইয়াবা প্রবেশ করে মিয়ানমার সীমান্ত হয়ে। ইয়াবার চালানের ৭০ শতাংশই মজুত করা হয় রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে। এরপর সেখান থেকে তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে। ২০২২ সালে রোহিঙ্গা শিবিরে অন্তত ২৫ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। ওই সময়ে বিভিন্ন অপরাধের কারণে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির থেকে অন্তত এক হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে নানা গ্রুপে সংঘাত ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গারা প্রায়ই শিবির ছেড়ে বের হয়ে আসছেন। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছে কাঠের তৈরি নৌকায় করে। সম্প্রতি এই প্রবণতা আরো বেড়েছে। জাতিসংঘের হিসাব বলছে, ২০২১ সালে যেখানে মাত্র ৫০০ রোহিঙ্গা সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, ২০২২ সালে সেই সংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার ৪০০ জন। বেআইনিভাবে বাংলাদেশের এনআইডি এবং পাসপোর্ট নেয়ারও অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে কক্সবাজারের সাড়ে তিন হাজার একর বনভূমি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, যা কক্সবাজারের মোট বনাঞ্চলের ১.৬৭ শতাংশ। রোহিঙ্গাদের জ্বালানির চাহিদা মেটানোর জন্য বিপুল পরিমাণ গাছ কাটতে হচ্ছে, যা স্থানীয় জীব-বৈচিত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নিয়মিত ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে, নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এইসব পরিস্থিতি কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে রোহিঙ্গা বিরোধী মনোভাব বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের কোণঠাসা মনে করছেন।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে রোহিঙ্গা বিষয়টি এসেছে। জাপান আর্থিক এবং প্রত্যাবসনে সহায়তার কথা বলেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ফোরামে বিষয়গুলো তুললেও পরবর্তীতে কূটনৈতিক ফলোআপে ধারাবাহিকতা থাকে না। তার কথা, জাপানের মতো মিয়ানমারের আরো যেসব বন্ধু রাষ্ট্র আছে, তাদের নিয়ে আমাদের সরকারকে কাজ করতে হবে। তাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগে যুক্ত করতে হবে। জাপান পারে আসিয়ানে বিষয়টি তুলতে। এখন সেটা আমাদের দিক থেকে করতে হবে। আমাদের তৎপরতার ওপর নির্ভর করছে বিশ্ব কতটা এগিয়ে আসে। ওইভাবে স্যাংশন তো হবে না। তাই মিয়ানমারকে চাপে রাখতে আমাদের সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেয়া দরকার। মিয়ানমারে সামরিক শাসন চলছে। তাই হয়তো প্রত্যাবাসন কঠিন হবে। কিন্তু তারপরও আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, সামনে নির্বাচন। এই সময়ে হয়ত রোহিঙ্গা ইস্যুটি সরকার অতটা গুরুত্ব দেবে না। যদি এটা হয় তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মনে করতে পারে বিষয়টিকে আমরা এখন আর ততটা গুরুত্ব দিচ্ছি না- এমন যেন না হয়। আর সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং কূটনীতিক মো. হুমায়ুন কবির মনে করেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়াই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের একমাত্র পথ। কিন্তু সেটা এগোচ্ছে না। প্রত্যাবাসন যত দেরি হবে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের ভিতরে সংকট ততই বাড়বে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। জাপান বাংলাদেশকে সহায়তার কথা বলেছে। কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক ভালো। তারা সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। অর্থ সহায়তা বা অন্য কোনো ধরনের সহায়তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার উদ্যোগে সহায়তা করা। জাপান চাইলে এটা ত্বরান্বিত হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান স্পষ্ট নয়।

তার কথা, চীন এই সময়ে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক। সেটা সফল হলেও রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া শুরু হবে। আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে। ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র তারাও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কিছু বলছে না। তিনি মনে করেন, মিয়ানমারকে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ফেলতে না পারলে আসলে এই সমস্যার সমাধান কঠিন হবে।