পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬ শতাংশ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ শতাংশ আর মেডিকেল কলেজের ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের ৪১% শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার: জরিপ

- আপডেট সময় ১২:২৯:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫
- / ৩০ বার পড়া হয়েছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস বন্ধ থাকার পর রোববার খুললে কলা ভবনের সামনে দলবেঁধে শিক্ষার্থীরা কেউ যাচ্ছেন ক্লাসে কেউ, আবার অনেকেই ক্লাস শেষে ফিরছেন।
দেশের উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে নানাভাবে ‘বৈষম্যের শিকার’ বলে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক জরিপে উঠে এসেছে।
দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা এ জরিপের তথ্য বলছে, বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ ছাত্রী আর ছাত্র ৪৯ শতাংশ।
এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ শতাংশ আর মেডিকেল কলেজের ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে, লাইব্রেরি, ক্যাফে, পরীক্ষার ফলে বৈষম্য, সহপাঠীর আচরণ, বন্ধুদের আড্ডা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবহার, লিঙ্গভিত্তিক আচরণ, আর্থিক কারণ, রাজনৈতিক মতপার্থক্য, শারীরিক অবয়ব, জাতিগত পার্থক্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও যে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, সেগুলো জরিপে তুলে ধরেছে আঁচল ফাউন্ডেশন।
চলতি বছরের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা স্নাতক পর্যায়ের সরকারি বেসরকারি কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ১ হাজার ১৭৩ শিক্ষার্থী নিয়ে অনলাইনে এ জরিপ চালিয়েছে আঁচল ফাউন্ডেশন।
শনিবার ভিডিও কলে সংবাদ সম্মেলনে সমীক্ষার ফল তুলে ধরা হয়। আঁচল ফাউন্ডেশনের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ইউনিটের টিম লিডার ফারজানা আক্তার লাবনী তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন।
‘বৈষম্য বেশি শ্রেণিকক্ষে, পরীক্ষার ফলে’
উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের যে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী নানাভাবে বৈষম্যের শিকার, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ফলাফলের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা বলছেন।
প্রায় ৩০ শতাংশের দাবি, তারা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শিকার। ১৯ শতাংশ ধর্মীয় বৈষম্য, শারীরিক অক্ষমতায় প্রায় ৭ শতাংশ ও জাতিগত পার্থক্যের কারণে ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
আর্থিক কারণে প্রায় ২৩ শতাংশ, শারীরিক অবয়বের কারণে ২৯ শতাংশ এবং রাজনৈতিক মত পার্থক্যের কারণে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
জরিপে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে তারা বেশি (৬০%) বৈষম্যের শিকার। ১৯ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বা ডরমিটরিতে আর শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান-কর্মসূচিতে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৪৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৫০ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী বলছেন, তারা বন্ধুদের আড্ডায় তাদের বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনে বৈষম্যের শিকার প্রায় ১৮ শতাংশ। এর বাইরে লাইব্রেরি, ক্যাফে, পরীক্ষার হলেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে তাদের।
বৈষম্য সহপাঠীদের আচরণেও
আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, প্রায় ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী সহপাঠীদের বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার। শিক্ষকের বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে দায়ী করেছেন। প্রায় ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দায়ী করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের।
স্নাতকের শেষ দুই বছর অর্থাৎ তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন বলে উঠে এসেছে জরিপে।
জরিপের তথ্য বলছে, বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের ৯০ শতাংশের ওপর মানসিক প্রভাব পড়েছে।
৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, এ ধরনের আচরণ তাদের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলেছে। মোটামুটি প্রভাব পড়েছে ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থীর ওপর আর ৬ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর ওপর কোনো প্রভাব পড়েনি।
বেশিরভাগই কোনো অভিযোগ দেননি
বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অভিযোগ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে। আর ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বলছেন, তারা কোনো অভিযোগ দেননি।
আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, অনলাইনে পাঠানো প্রশ্নের জবাব দেন শিক্ষার্থীরা। জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী, পুরুষ শিক্ষার্থী ৪৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ অংশ নেন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ‘সাইকিয়াট্রিস্ট’ সায়েদুল ইসলাম সাঈদ, ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের আইনজীবী হাবিবুর রহমান, ‘পার্সপেক্টিভ’ এর নির্বাহী সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ সিবগা এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জনাব তানসেন রোজ অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত ছিলেন।
সুপারিশ
জরিপের ফলের ভিত্তিতে আঁচল ফাউন্ডেশনের সাতটি প্রস্তাব তুলে ধরেছে। সেগুলো হল-
>> শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে মেন্টরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
>> ছয় মাস অন্তর শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং করা।
>> বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধে মনিটরিং টিম গঠন ও কঠোর আইন প্রয়োগ।
>> প্রতিটি বিভাগে অভিযোগ বক্স রাখা ও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ‘কমপ্লেইন সেল’ গঠন।
>> শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা।
>> উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থান দিকনির্দেশনায় ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেন্টার চালু।
>> সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা।
নিঝুম আহমেদ – জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : বিডিপলিটিক্স টোয়েন্টিফোর ডটকম