জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে প্রায় অস্তিত্বহীন
- আপডেট সময় ০৯:৫৯:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬
- / ১৩ বার পড়া হয়েছে
ক্ষমতার মধ্যে থেকে জন্ম নেওয়া এবং নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে একাধিকবার ক্ষমতায় যাওয়া জাতীয় পার্টি (জাপা) এখন রাজনীতিতে প্রায় অস্তিত্বহীন। বারবার ভাঙন এবং বহুধারায় বিভক্ত দলটি এবারের জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনও জয়ী হতে পারেনি। ফলে দীর্ঘ ৩৮ বছর টানা সংসদে থাকা জাতীয় পার্টি এবার সংসদ থেকেও ছিটকে পড়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৯৫টি আসনে প্রার্থী দেয় জাতীয় পার্টি।
তবে একটি আসনেও দলটির প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি। দলের অধিকাংশ প্রার্থীই তাদের জামানত হারিয়েছেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত দলটি এখন কয়েকটি ধারায় বিভক্ত। এরশাদের জীবদ্দশাতেই দলটি কয়েকটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
দলের মূল অংশটি দীর্ঘদিন তার নেতৃত্বেই ছিল। এরশাদের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী রওশন এরশাদ এবং পরে ছোট ভাই জি এম কাদের দলটির এই অংশের নেতৃত্বে আসেন। বর্তমানে জি এম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে দলটি জাতীয় সংসদে টানা প্রতিনিধিত্ব করে এসেছে।
কখনো ক্ষমতায়, কখনো বিরোধী দলে থেকেছে দলটি। দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি (জাপা) প্রধান বিরোধী দল ছিল।
২০০৯ সালে গঠিত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারে জাতীয় পার্টি থেকে একজন মন্ত্রী এবং ২০১৪ সালে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জাতীয় পার্টি থেকে একজন মন্ত্রী ও দুইজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এ ছাড়া ২০১৩ সালে গঠিত নির্বাচনকালীন সরকারেও দলটির কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, যে সরকারের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
তবে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদের পতনের পর এবারই প্রথম কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি একটি আসনও পায়নি।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ। এরপর তিনি জাতীয় পার্টি নামে এই রাজনৈতিক দলটি গঠন করেন।
১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেন এরশাদ। ওই নির্বাচনে ১৫৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে জাতীয় পার্টি। তবে ওই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অংশ নেয়নি। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু জাতীয় পার্টি সরকার গঠনের পর থেকেই বিরোধী দলগুলো আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে।
একপর্যায়ে ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে বিরোধী দলগুলোর সংসদ সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ করেন। পরে ২৭ নভেম্বর এরশাদ জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং ৬ ডিসেম্বর সংসদ ভেঙে দেন।
এরপর ১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন পায়। যদিও ওই নির্বাচনে দেশের মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দলই অংশ নেয়নি। ওই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জাতীয় পার্টি পুনরায় সরকার গঠন করে।
এরপর শুরু হয় এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ পদত্যাগ করেন।
গণঅভ্যুত্থানের পরও ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি ৩৫টি আসন পায়। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অধিকাংশ দল অংশ নেয়নি, জাতীয় পার্টিও অংশ নেয়নি। তবে ওই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩২টি আসন পায়।
এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে ১৮টি, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ২৭টি, ২০১৪ সালে ৩৪টি, ২০১৮ সালে ২২টি এবং ২০২৪ সালে ১১টি আসনে জয়লাভ করে জাতীয় পার্টি। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনে দলটি কোনো আসনই পায়নি। ফলে দলটির সংসদীয় রাজনীতির ধারাবাহিকতায় বড় ধাক্কা লাগে। শুধু তাই নয়, দলটির ভবিষ্যৎ রাজনীতিও অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় পার্টি পুনরায় ভেঙে যায়। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কিছু নেতা আলাদা সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেদের ‘মূল জাতীয় পার্টি’ দাবি করেন। ওই অংশের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার। তাদের সঙ্গে দলের বেশ কিছু প্রভাবশালী নেতাও যুক্ত হন।
তারা দলীয় প্রতীক ‘লাঙ্গল’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে আদালতে যান এবং নির্বাচন কমিশনে ১১৯টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেন। তবে নির্বাচন কমিশনের নথিতে চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদের এবং মহাসচিব হিসেবে শামীম হায়দার পাটোয়ারীর নাম থাকায় আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারের অংশের মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করা হয়।
জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ১৯৫টি আসনে ‘লাঙ্গল’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে একটি আসনেও জাতীয় পার্টির প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ আসনেই দলের প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছেন। এমনকি শতকরা এক ভাগ ভোটও পায়নি দলটি। দলটির প্রাপ্ত ভোট ০.৮৮ শতাংশ।
নির্বাচনের আগেও দীর্ঘদিন দলটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে বাধা এসেছে, হামলা হয়েছে। নির্বাচনে এই বিপর্যয়ের ফলে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা জাতীয় পার্টির জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবে জাতীয় পার্টির নেতাদের অভিযোগ, নির্বাচনে নীলনকশা করে দলটিকে হারানো হয়েছে। রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই নীলনকশা করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। এ জন্য তারা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করছেন।
দলটির নেতারা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের দলীয় কার্যালয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও মামলাসহ নানা জটিলতায় পড়েন জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতারা। একই সঙ্গে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও জুলাই ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা বারবার জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তোলেন।
জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার দাবিও ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সংলাপেও জাতীয় পার্টিকে ডাকা হয়নি বা আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমন বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেই জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেয়।
তাদের দাবি, নির্বাচন এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে যাতে জাতীয় পার্টি কোনো আসনই না পায়।
দলটির নেতারা আরও বলেন, নির্বাচনে একটি আসনও না পাওয়া এবং এত কম ভোট পাওয়ায় যে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তা সাময়িক। এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে দলটি আবার রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াবে বলে তারা আশা করছেন।
এর জন্য রোজার পর সাংগঠনিকসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তারা জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী জানান, অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টিকে স্বাভাবিক কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি। কর্মসূচি পালন করতে গেলে বাধা দেওয়া হয়েছে, হামলাও হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের পর আমরা একটি বড় ইফতার আয়োজন করেছি। নির্বাচনে যারা প্রার্থী ছিলেন, তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। রোজার পর কর্মসূচি দেওয়া হবে, আমরা জেলাগুলো সফর করব।
নির্বাচনে ভরাডুবির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রিত ভোট হয়েছে। জাতীয় পার্টি যাতে ভোট না পায়, একটি আসনও না পায়—সে জন্য নীলনকশা করা হয়েছিল। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা ছিল, যাতে জাতীয় পার্টি এক শতাংশ ভোটও না পায়। নির্বাচন কমিশনও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারেনি।
তবে শামীম হায়দার পাটোয়ারী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জাতীয় পার্টি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। এই হতাশা সাময়িক, আমরা তা কাটিয়ে উঠব।
বিডি পলিটিক্স/বিইউ




















