০৭:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬

টানাপোড়েন শেষে স্বাভাবিক হচ্ছে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক?

নিজস্ব সংবাদ দাতা
  • আপডেট সময় ০৫:৪৫:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১৪ বার পড়া হয়েছে

দিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক তিক্ততা ও টানাপোড়েন কাটিয়ে স্বাভাবিক হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে এই সফরের মধ্যে দিয়ে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ জ্বালানি সহায়তাও পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সরকার টানা ১৬ বছরে ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলো। সেই সময়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা সেই সম্পর্ককে ‘সোনালী অধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করতেন।

তখন উভয়পক্ষের মধ্যে প্রায় শতাধিক চুক্তি ও সমঝোতা সই হয়। এসব চুক্তি ও সমঝোতা নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনাও ছিলো।
এছাড়া ভোটারবিহীন নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতের ভূমিকা ছিল ব্যাপকভাবে সমালোচিত।

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের তীব্র টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের এই ভারত সফরকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার বার্তা
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখতে চায় দেশটি। আর সে কারণেই অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নানা ইস্যুতে ভারতের তীব্র টানাপোড়েন ও তিক্ততা চলে আসছিল। তবে জাতীয় নির্বাচনের আগেই বিএনপির দিকে অনেকটাই ঝুঁকে পড়েছিলো ভারত। কেননা বিএনপি ছাড়া ভারতের আর কোনো বিকল্প ছিল না। সে কারণে এবার নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সঙ্গেই ভারত সম্পর্ক রেখে সামনে এগিয়ে যেতে চায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সফরে দিল্লির পক্ষ থেকে তেমন বার্তাই দেওয়া হয়েছে।

দিল্লিতে ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর এক বার্তায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও তার প্রতিনিধিদলকে আতিথ্য দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। আমরা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা করেছি। এছাড়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঘটনাবলী নিয়ে মতবিনিময় করেছি। ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হয়েছি।

দিল্লির কাছে যা চাইলো ঢাকা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির দি‌ল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ পুরী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর ভারতের কাছে শেখ হাসিনা এবং তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে বাংলাদেশে ফেরত চেয়েছেন। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ ওসমান হাদীর সন্দেহভাজন হত্যাকারীদেরও ফেরত চান তিনি। এছাড়া ডিজেল ও সারের সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর অনুরোধ করেন। বৈঠকে ভারতের ভিসা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা, বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসা সহজ করা হবে।

এদিকে ভারতের কাছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিও তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সদ্য নির্বাচিত বিএনপি সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি এবং পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও উভয়পক্ষের সুবিধার ভিত্তিতে তার পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবেন।

ঢাকাকে যে বার্তা দিলো দিল্লি
পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জয়শঙ্কর বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার জন্য ভারতের আকাঙ্ক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বৈঠকের বিষয়ে জানানো হয়েছে, উভয় পক্ষ দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অংশীদারত্ব গভীর করার জন্য প্রস্তাব খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেছে।

আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনীতিতেও গুরুত্ব
পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. খলিলুর রহমান প্রথম সফরে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে জেদ্দা যান। এরপর তিনি দ্বিতীয় দেশ হিসেবে ১৪ মার্চ তুরস্ক হয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। চতুর্থ দেশ হিসেবে তিনি ভার‍ত সফরে গেলেন। অবশ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে আরও কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো। তবে সেসব দেশে সফরে না গিয়ে ভারত গেছেন। যদিও এটি একটি শুভেচ্ছা সফর। আর মরিশাসে ভারত মহাসাগর সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাঝপথে তিনি দিল্লিতে গেছেন। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতেই আগ্রহী সরকার। আঞ্চলিক ও ভূরাজনীতিতে এই সফরে বিশেষ বার্তা দেওয়া হলো। সে কারণেই বিভিন্ন দেশে আমন্ত্রণ থাকলেও ভারতকে বেছে নিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য
পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ইমতিয়াজ আহমেদ বুধবার বাংলানিউজকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে যে টানাপোড়েন ছিল, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরের মধ্যে দিয়ে সেটা কাটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে উঠবে বলে আশা করছি। ভারতের পক্ষ থেকে আগেই বলা হয়েছিল, তারা বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আমরা জ্বালানি সঙ্কটে পড়েছি। বিশেষ করে আমাদের এখন ডিজেলের সঙ্কট রয়েছে। এক্ষেত্রে ভারত আমাদের সহায়তা করতে পারে। কেননা তাদের রিফাইনারি স্টেশন রয়েছে। আর একটি সমস্যা রয়েছে ভিসার ক্ষেত্রে। আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য, চিকিৎসার জন্য ছাড়াও বিভিন্ন কারণে ভিসার দরকার হয়। এই সফরের মধ্য দিয়ে ভিসা সহজীকরণ হতে পারে।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। সেই সময়ে আওয়ামী লীগ ভারতের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছিলো। তবে এখন বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। এখন বিএনপি সরকার বাস্তবসম্মতভাবে আত্মমর্যাদার সাথে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়। এই সফরের মাধ্যমেই সেই বার্তাই পেল ভারত।

সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যা বলছেন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে দিল্লিতে সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। ভারত সফরের বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেছেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তো আর হবে না। তিনি এখন বাংলাদেশে অস্তিত্বহীন, রাজনৈতিকভাবে মরে গেছেন অনেকদিন হয়ে গেছে। হাসিনা আর আওয়ামী লীগ বলতে বাংলাদেশে কিছু নেই। সে কারণে এটা হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটা নতুন সম্পর্ক। ভবিষ্যতে আমরা কীভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে পারি, মানুষে মানুষে সম্পর্ক করতে পারি, যাতে সম্পর্কটা ভারতের কোনো ব্যক্তির সাথে না হয়ে যায়…। কীভাবে আগামীতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কিছু কিক স্টার্ট করা যায়, সেটি নিয়েই আমাদের আলোচনা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের ভারত সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও জনকূটনীতি অনুবিভাগের মহাপরিচালক মাহবুবুল আলম জানিয়েছিলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের মন্ত্রীদের বৈঠকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহকে ভবিষ্যতে আরও ফলপ্রসূ ও টেকসই পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে এ সফর গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিডি পলিটিক্স/বিইউ

ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

টানাপোড়েন শেষে স্বাভাবিক হচ্ছে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক?

আপডেট সময় ০৫:৪৫:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক তিক্ততা ও টানাপোড়েন কাটিয়ে স্বাভাবিক হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে এই সফরের মধ্যে দিয়ে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ জ্বালানি সহায়তাও পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সরকার টানা ১৬ বছরে ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলো। সেই সময়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা সেই সম্পর্ককে ‘সোনালী অধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করতেন।

তখন উভয়পক্ষের মধ্যে প্রায় শতাধিক চুক্তি ও সমঝোতা সই হয়। এসব চুক্তি ও সমঝোতা নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনাও ছিলো।
এছাড়া ভোটারবিহীন নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতের ভূমিকা ছিল ব্যাপকভাবে সমালোচিত।

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের তীব্র টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের এই ভারত সফরকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার বার্তা
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখতে চায় দেশটি। আর সে কারণেই অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নানা ইস্যুতে ভারতের তীব্র টানাপোড়েন ও তিক্ততা চলে আসছিল। তবে জাতীয় নির্বাচনের আগেই বিএনপির দিকে অনেকটাই ঝুঁকে পড়েছিলো ভারত। কেননা বিএনপি ছাড়া ভারতের আর কোনো বিকল্প ছিল না। সে কারণে এবার নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সঙ্গেই ভারত সম্পর্ক রেখে সামনে এগিয়ে যেতে চায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সফরে দিল্লির পক্ষ থেকে তেমন বার্তাই দেওয়া হয়েছে।

দিল্লিতে ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর এক বার্তায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও তার প্রতিনিধিদলকে আতিথ্য দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। আমরা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা করেছি। এছাড়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঘটনাবলী নিয়ে মতবিনিময় করেছি। ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হয়েছি।

দিল্লির কাছে যা চাইলো ঢাকা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির দি‌ল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ পুরী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর ভারতের কাছে শেখ হাসিনা এবং তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে বাংলাদেশে ফেরত চেয়েছেন। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ ওসমান হাদীর সন্দেহভাজন হত্যাকারীদেরও ফেরত চান তিনি। এছাড়া ডিজেল ও সারের সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর অনুরোধ করেন। বৈঠকে ভারতের ভিসা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা, বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসা সহজ করা হবে।

এদিকে ভারতের কাছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিও তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সদ্য নির্বাচিত বিএনপি সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি এবং পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও উভয়পক্ষের সুবিধার ভিত্তিতে তার পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবেন।

ঢাকাকে যে বার্তা দিলো দিল্লি
পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জয়শঙ্কর বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার জন্য ভারতের আকাঙ্ক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বৈঠকের বিষয়ে জানানো হয়েছে, উভয় পক্ষ দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অংশীদারত্ব গভীর করার জন্য প্রস্তাব খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেছে।

আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনীতিতেও গুরুত্ব
পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. খলিলুর রহমান প্রথম সফরে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে জেদ্দা যান। এরপর তিনি দ্বিতীয় দেশ হিসেবে ১৪ মার্চ তুরস্ক হয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। চতুর্থ দেশ হিসেবে তিনি ভার‍ত সফরে গেলেন। অবশ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে আরও কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো। তবে সেসব দেশে সফরে না গিয়ে ভারত গেছেন। যদিও এটি একটি শুভেচ্ছা সফর। আর মরিশাসে ভারত মহাসাগর সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাঝপথে তিনি দিল্লিতে গেছেন। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতেই আগ্রহী সরকার। আঞ্চলিক ও ভূরাজনীতিতে এই সফরে বিশেষ বার্তা দেওয়া হলো। সে কারণেই বিভিন্ন দেশে আমন্ত্রণ থাকলেও ভারতকে বেছে নিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য
পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ইমতিয়াজ আহমেদ বুধবার বাংলানিউজকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে যে টানাপোড়েন ছিল, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরের মধ্যে দিয়ে সেটা কাটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে উঠবে বলে আশা করছি। ভারতের পক্ষ থেকে আগেই বলা হয়েছিল, তারা বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আমরা জ্বালানি সঙ্কটে পড়েছি। বিশেষ করে আমাদের এখন ডিজেলের সঙ্কট রয়েছে। এক্ষেত্রে ভারত আমাদের সহায়তা করতে পারে। কেননা তাদের রিফাইনারি স্টেশন রয়েছে। আর একটি সমস্যা রয়েছে ভিসার ক্ষেত্রে। আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য, চিকিৎসার জন্য ছাড়াও বিভিন্ন কারণে ভিসার দরকার হয়। এই সফরের মধ্য দিয়ে ভিসা সহজীকরণ হতে পারে।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। সেই সময়ে আওয়ামী লীগ ভারতের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছিলো। তবে এখন বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। এখন বিএনপি সরকার বাস্তবসম্মতভাবে আত্মমর্যাদার সাথে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়। এই সফরের মাধ্যমেই সেই বার্তাই পেল ভারত।

সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যা বলছেন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে দিল্লিতে সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। ভারত সফরের বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেছেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তো আর হবে না। তিনি এখন বাংলাদেশে অস্তিত্বহীন, রাজনৈতিকভাবে মরে গেছেন অনেকদিন হয়ে গেছে। হাসিনা আর আওয়ামী লীগ বলতে বাংলাদেশে কিছু নেই। সে কারণে এটা হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটা নতুন সম্পর্ক। ভবিষ্যতে আমরা কীভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে পারি, মানুষে মানুষে সম্পর্ক করতে পারি, যাতে সম্পর্কটা ভারতের কোনো ব্যক্তির সাথে না হয়ে যায়…। কীভাবে আগামীতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কিছু কিক স্টার্ট করা যায়, সেটি নিয়েই আমাদের আলোচনা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের ভারত সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও জনকূটনীতি অনুবিভাগের মহাপরিচালক মাহবুবুল আলম জানিয়েছিলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের মন্ত্রীদের বৈঠকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহকে ভবিষ্যতে আরও ফলপ্রসূ ও টেকসই পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে এ সফর গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিডি পলিটিক্স/বিইউ