০৪:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জাতিসংঘ মহাসচিব “প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে”

মিজানুর রহমান খান
  • আপডেট সময় ০২:১৩:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ মার্চ ২০২৫
  • / ৩৬ বার পড়া হয়েছে

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শুক্রবার কক্সবাজারের উখিয়ায় শরণার্থীশিবিরে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে ইফতার করেছেন।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) দপ্তর গতকাল ইফতার অনুষ্ঠানটি আরআরআরসির ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচার করে।

অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, তহবিলের কাটছাঁটের ফলে নাটকীয় প্রভাব পড়বে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর। এর পাশাপাশি মিয়ানমারের অবনতিশীল পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সুনির্দিষ্ট সহায়তা এবং পদক্ষেপের মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে।

আন্তোনিও গুতেরেসের পাশে বসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা যেন আগামী বছর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাঁদের নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়ে ঈদ উদ্‌যাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে জাতিসংঘের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছি।’

চার দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল দুপুরে জাতিসংঘ মহাসচিব এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে কক্সবাজারে পৌঁছান। দুপুরে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে বাংলাদেশে কাজ করা জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের কাজের বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবকে অবহিত করে।

রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের সময় সেখানে শিশু, তরুণ, ইমাম ও নারী শিক্ষকদের সঙ্গে আলাদাভাবে মতবিনিময় করেন মহাসচিব। এরপর প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব এক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করেন।

সাধারণত রোহিঙ্গারা যে ধরনের ইফতারির সঙ্গে পরিচিত, সেটাই পরিবেশন করা হয় ইফতারে। ছিল খেজুর, শসা, টমেটো, ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, বনরুটি আর জুস। উখিয়ার ২০ নম্বর এক্সটেনশন নামে পরিচিত শিবিরের আশপাশের ইফতার অনুষ্ঠানে ছিল অন্য রকম এক আন্তরিক পরিবেশ। রাখাইনে নিজেদের আবাসে মর্যাদার সঙ্গে ফেরা নিয়ে সংশয়, জনপ্রতি রেশন বরাদ্দের অর্থ কমে যাওয়া—এসব ছাপিয়ে যেন রোহিঙ্গাদের ছুঁয়ে যায় ইফতারের আনন্দ।

ইফতার অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান উপস্থিত ছিলেন। গতকাল রাতেই প্রধান উপদেষ্টা এবং জাতিসংঘের মহাসচিব কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফিরেছেন।

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বক্তৃতা দেন প্রধান উপদেষ্টা। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের দুঃখ দেখে সমাধান করতে জাতিসংঘ মহাসচিব এসেছেন। এই ঈদে না হোক, আগামী ঈদে রোহিঙ্গারা নিজের দেশে ঈদ করতে পারবেন, সেই প্রত্যাশা করি।’ তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরাতে সারা দুনিয়ার সঙ্গে প্রয়োজনে লড়াই করতে হবে। ঈদে মানুষ আত্মীয়স্বজনের কবর জিয়ারত করে। রোহিঙ্গাদের সেই সুযোগও নেই।

রোহিঙ্গাদের প্রতি বিশ্বের সমর্থন প্রয়োজন: গুতেরেস

আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘আমি এই পবিত্র রমজান মাসে সংহতির লক্ষ্যে কক্সবাজারে এসেছি। এই সংহতি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে এবং বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যারা রোহিঙ্গাদের এত উদারভাবে আশ্রয় দিয়েছে। আমি এখানে রোহিঙ্গাদের দুর্দশার ওপর বিশ্বব্যাপী আলোকপাত করতে এসেছি, সেই সঙ্গে তাদের সম্ভাবনার কথাও বলছি। এখানে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিশ্বের সমর্থন প্রয়োজন।’

আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে আরাকানে সংঘটিত সহিংসতার কারণে এখানে এসেছে রোহিঙ্গারা। সম্প্রতি আরও বেশ কিছু রোহিঙ্গা এ দেশে প্রবেশ করেছে। যেকোনো মানুষ তার পরিবারের নিরাপত্তা, সুরক্ষা, আত্মমর্যাদার সন্ধান করে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী একই কারণে এখানে এসেছে। আমি আজ এখানে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। অনেকেই তাঁদের মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার দুঃসহ ঘটনা তুলে ধরেছেন।’

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে এখনো অস্থিরতা বিরাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে আমরা একটা মানবিক সংকটের মধ্যে আছি। বিভিন্ন দেশের মানবিক সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার ঘটনায় আমরা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে আছি। রোহিঙ্গাদের খাদ্য রেশনের পরিমাণ আরও কমিয়ে আনার ঝুঁকিতে আছে। এ ধরনের দুর্যোগ আমরা প্রত্যাশা করি না। কারণ, মানুষের দুর্ভোগ হবে এবং মারাও যেতে পারে।’

জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের পাশে না দাঁড়ায়, আমি এই ইস্যুতে কথা বলেই যাব। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব। বাংলাদেশের মানুষের জমি, বন, সম্পদ রোহিঙ্গাদের জন্য উৎসর্গ করে দেওয়ার কৃতিত্ব তাদের দিতেই হবে।’

আন্তোনিও গুতেরেস ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সফরের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘তখনকার তুলনায় শিবিরের অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে এখানে অনেক চ্যালেঞ্জও আছে। এই শিবিরগুলো জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মধ্যে আছে। ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমে বন্যা, ভূমিধস ঘরবাড়ি এবং জীবন দুটিই কেড়ে নেয়। সুতরাং এই জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করে বোঝাতে হবে যে বিশ্ব তাদের ভুলে যায়নি। তাই যে মানবিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সেটি অগ্রহণযোগ্য।’

আন্তোনিও গুতেরেস জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য দেশি-বিদেশি সংস্থার বিপুল তহবিল হ্রাসের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানান। আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, এর (তহবিল হ্রাস) সরাসরি এবং ভয়াবহ প্রভাব পড়বে মানুষের ওপর—তাদের বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত খাবার আছে কি না, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা আছে কি না, অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা এবং সুরক্ষা আছে কি না, তার ওপর। পুরো শরণার্থী জনগোষ্ঠীই মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বাজেট হ্রাসের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কক্সবাজারের লোকজনের ওপর, যাদের সহায়তার প্রয়োজনটা অনেক বেশি। এখানে এটা স্পষ্ট যে বাজেটের কাটছাঁট মানে কিন্তু ব্যালান্স শিটের সংখ্যা নয়। তহবিল হ্রাসের ফলে নাটকীয় মানবিক ক্ষতি হবে।

জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, ‘চূড়ান্তভাবে মিয়ানমারেই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। এখানে আশ্রিত শরণার্থীদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য যতক্ষণ না পরিস্থিতি অনুকূল হচ্ছে, আমরা সেই পর্যন্ত হাল ছাড়ছি না। ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে সংহতি এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন—যেমন প্রয়োজন বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি।’

এর আগে রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ বড় জমায়েতটি ছিল ছয় বছর আগে, ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট। সেবার রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা ঢলের দুই বছর পূর্তিতে উখিয়ার কুতুপালং মধুরছড়া (ক্যাম্প ৪) বিশাল তিনটি মাঠ ও পাহাড়ে জড়ো হয়েছিলেন এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা। ওই সমাবেশের নেপথ্যের ব্যক্তিটি আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান ছিলেন মুহিব উল্লাহ। ওই সমাবেশের প্রায় দুই বছর পর কয়েকজন রোহিঙ্গার গুলিতে তিনি নিহত হন। এরপর কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে রোহিঙ্গারা।

গতকাল গুতেরেসের সম্মানে অধ্যাপক ইউনূসের ইফতার অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে রোহিঙ্গাদের মনে হয়েছে, তাঁরা নেতৃত্বশূন্য হননি। বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ইফতারের পর তাঁর বক্তৃতা দিয়েছেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়। নির্ধারিত দোভাষী থাকার পরও রোহিঙ্গা আর গুতেরেসের মাঝে সেতুবন্ধ হয়ে উঠেছিলেন অধ্যাপক ইউনূস।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের মধ্যেও বিশ্ব তাদের ভোলেনি। জাতিসংঘের মহাসচিবের আগমনের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সংকট আবার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উঠে এল—গতকাল ইফতার অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া লোকজনের এমনটাই মনে হয়েছে।

কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল দুপুরে রোহিঙ্গা শিবিরে জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় সবাই রাখাইনে ফেরার আকুতি জানান। রাখাইনে ফেরার আগপর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ আর কাজের সুযোগের বিষয়গুলো জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে তুলেছেন রোহিঙ্গারা। আর তাঁদের প্রায় সবার কথাই ছিল, মাথাপিছু রেশন মাসে সাড়ে ১২ ডলার থেকে ৬ ডলারে নেমে আসায় ওই বরাদ্দ দিয়ে সারা মাসে প্রতি বেলায় একটা করে কলা সংগ্রহ করাই যে কঠিন হয়ে পড়বে!

ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জাতিসংঘ মহাসচিব “প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে”

আপডেট সময় ০২:১৩:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ মার্চ ২০২৫

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শুক্রবার কক্সবাজারের উখিয়ায় শরণার্থীশিবিরে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে ইফতার করেছেন।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) দপ্তর গতকাল ইফতার অনুষ্ঠানটি আরআরআরসির ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচার করে।

অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, তহবিলের কাটছাঁটের ফলে নাটকীয় প্রভাব পড়বে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর। এর পাশাপাশি মিয়ানমারের অবনতিশীল পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সুনির্দিষ্ট সহায়তা এবং পদক্ষেপের মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে।

আন্তোনিও গুতেরেসের পাশে বসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা যেন আগামী বছর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাঁদের নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়ে ঈদ উদ্‌যাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে জাতিসংঘের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছি।’

চার দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল দুপুরে জাতিসংঘ মহাসচিব এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে কক্সবাজারে পৌঁছান। দুপুরে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে বাংলাদেশে কাজ করা জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের কাজের বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবকে অবহিত করে।

রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের সময় সেখানে শিশু, তরুণ, ইমাম ও নারী শিক্ষকদের সঙ্গে আলাদাভাবে মতবিনিময় করেন মহাসচিব। এরপর প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব এক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করেন।

সাধারণত রোহিঙ্গারা যে ধরনের ইফতারির সঙ্গে পরিচিত, সেটাই পরিবেশন করা হয় ইফতারে। ছিল খেজুর, শসা, টমেটো, ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, বনরুটি আর জুস। উখিয়ার ২০ নম্বর এক্সটেনশন নামে পরিচিত শিবিরের আশপাশের ইফতার অনুষ্ঠানে ছিল অন্য রকম এক আন্তরিক পরিবেশ। রাখাইনে নিজেদের আবাসে মর্যাদার সঙ্গে ফেরা নিয়ে সংশয়, জনপ্রতি রেশন বরাদ্দের অর্থ কমে যাওয়া—এসব ছাপিয়ে যেন রোহিঙ্গাদের ছুঁয়ে যায় ইফতারের আনন্দ।

ইফতার অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান উপস্থিত ছিলেন। গতকাল রাতেই প্রধান উপদেষ্টা এবং জাতিসংঘের মহাসচিব কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফিরেছেন।

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বক্তৃতা দেন প্রধান উপদেষ্টা। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের দুঃখ দেখে সমাধান করতে জাতিসংঘ মহাসচিব এসেছেন। এই ঈদে না হোক, আগামী ঈদে রোহিঙ্গারা নিজের দেশে ঈদ করতে পারবেন, সেই প্রত্যাশা করি।’ তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরাতে সারা দুনিয়ার সঙ্গে প্রয়োজনে লড়াই করতে হবে। ঈদে মানুষ আত্মীয়স্বজনের কবর জিয়ারত করে। রোহিঙ্গাদের সেই সুযোগও নেই।

রোহিঙ্গাদের প্রতি বিশ্বের সমর্থন প্রয়োজন: গুতেরেস

আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘আমি এই পবিত্র রমজান মাসে সংহতির লক্ষ্যে কক্সবাজারে এসেছি। এই সংহতি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে এবং বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যারা রোহিঙ্গাদের এত উদারভাবে আশ্রয় দিয়েছে। আমি এখানে রোহিঙ্গাদের দুর্দশার ওপর বিশ্বব্যাপী আলোকপাত করতে এসেছি, সেই সঙ্গে তাদের সম্ভাবনার কথাও বলছি। এখানে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিশ্বের সমর্থন প্রয়োজন।’

আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে আরাকানে সংঘটিত সহিংসতার কারণে এখানে এসেছে রোহিঙ্গারা। সম্প্রতি আরও বেশ কিছু রোহিঙ্গা এ দেশে প্রবেশ করেছে। যেকোনো মানুষ তার পরিবারের নিরাপত্তা, সুরক্ষা, আত্মমর্যাদার সন্ধান করে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী একই কারণে এখানে এসেছে। আমি আজ এখানে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। অনেকেই তাঁদের মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার দুঃসহ ঘটনা তুলে ধরেছেন।’

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে এখনো অস্থিরতা বিরাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে আমরা একটা মানবিক সংকটের মধ্যে আছি। বিভিন্ন দেশের মানবিক সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার ঘটনায় আমরা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে আছি। রোহিঙ্গাদের খাদ্য রেশনের পরিমাণ আরও কমিয়ে আনার ঝুঁকিতে আছে। এ ধরনের দুর্যোগ আমরা প্রত্যাশা করি না। কারণ, মানুষের দুর্ভোগ হবে এবং মারাও যেতে পারে।’

জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের পাশে না দাঁড়ায়, আমি এই ইস্যুতে কথা বলেই যাব। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব। বাংলাদেশের মানুষের জমি, বন, সম্পদ রোহিঙ্গাদের জন্য উৎসর্গ করে দেওয়ার কৃতিত্ব তাদের দিতেই হবে।’

আন্তোনিও গুতেরেস ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সফরের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘তখনকার তুলনায় শিবিরের অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে এখানে অনেক চ্যালেঞ্জও আছে। এই শিবিরগুলো জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মধ্যে আছে। ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমে বন্যা, ভূমিধস ঘরবাড়ি এবং জীবন দুটিই কেড়ে নেয়। সুতরাং এই জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করে বোঝাতে হবে যে বিশ্ব তাদের ভুলে যায়নি। তাই যে মানবিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সেটি অগ্রহণযোগ্য।’

আন্তোনিও গুতেরেস জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য দেশি-বিদেশি সংস্থার বিপুল তহবিল হ্রাসের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানান। আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, এর (তহবিল হ্রাস) সরাসরি এবং ভয়াবহ প্রভাব পড়বে মানুষের ওপর—তাদের বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত খাবার আছে কি না, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা আছে কি না, অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা এবং সুরক্ষা আছে কি না, তার ওপর। পুরো শরণার্থী জনগোষ্ঠীই মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বাজেট হ্রাসের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কক্সবাজারের লোকজনের ওপর, যাদের সহায়তার প্রয়োজনটা অনেক বেশি। এখানে এটা স্পষ্ট যে বাজেটের কাটছাঁট মানে কিন্তু ব্যালান্স শিটের সংখ্যা নয়। তহবিল হ্রাসের ফলে নাটকীয় মানবিক ক্ষতি হবে।

জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, ‘চূড়ান্তভাবে মিয়ানমারেই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। এখানে আশ্রিত শরণার্থীদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য যতক্ষণ না পরিস্থিতি অনুকূল হচ্ছে, আমরা সেই পর্যন্ত হাল ছাড়ছি না। ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে সংহতি এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন—যেমন প্রয়োজন বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি।’

এর আগে রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ বড় জমায়েতটি ছিল ছয় বছর আগে, ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট। সেবার রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা ঢলের দুই বছর পূর্তিতে উখিয়ার কুতুপালং মধুরছড়া (ক্যাম্প ৪) বিশাল তিনটি মাঠ ও পাহাড়ে জড়ো হয়েছিলেন এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা। ওই সমাবেশের নেপথ্যের ব্যক্তিটি আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান ছিলেন মুহিব উল্লাহ। ওই সমাবেশের প্রায় দুই বছর পর কয়েকজন রোহিঙ্গার গুলিতে তিনি নিহত হন। এরপর কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে রোহিঙ্গারা।

গতকাল গুতেরেসের সম্মানে অধ্যাপক ইউনূসের ইফতার অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে রোহিঙ্গাদের মনে হয়েছে, তাঁরা নেতৃত্বশূন্য হননি। বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ইফতারের পর তাঁর বক্তৃতা দিয়েছেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়। নির্ধারিত দোভাষী থাকার পরও রোহিঙ্গা আর গুতেরেসের মাঝে সেতুবন্ধ হয়ে উঠেছিলেন অধ্যাপক ইউনূস।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের মধ্যেও বিশ্ব তাদের ভোলেনি। জাতিসংঘের মহাসচিবের আগমনের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সংকট আবার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উঠে এল—গতকাল ইফতার অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া লোকজনের এমনটাই মনে হয়েছে।

কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল দুপুরে রোহিঙ্গা শিবিরে জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় সবাই রাখাইনে ফেরার আকুতি জানান। রাখাইনে ফেরার আগপর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ আর কাজের সুযোগের বিষয়গুলো জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে তুলেছেন রোহিঙ্গারা। আর তাঁদের প্রায় সবার কথাই ছিল, মাথাপিছু রেশন মাসে সাড়ে ১২ ডলার থেকে ৬ ডলারে নেমে আসায় ওই বরাদ্দ দিয়ে সারা মাসে প্রতি বেলায় একটা করে কলা সংগ্রহ করাই যে কঠিন হয়ে পড়বে!