“ওর মতো একটা প্রতিবন্ধী ছেলে জেলে আছে। টেনশন হচ্ছে; কীভাবে যে কী করতেছে,” বলেন সাইদের মা।
‘স্লোগান দিয়ে’ কারাগারে ‘বাকপ্রতিবন্ধী’ সাইদ, দুশ্চিন্তায় পরিবার

- আপডেট সময় ১২:০০:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / ৮ বার পড়া হয়েছে
গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের পাশে ২৪ অগাস্ট ঝটিকা মিছিল করে আওয়ামী লীগ, যেখান থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে সাইদ শেখও আছেন, যিনি একজন ‘বাকপ্রতিবন্ধী’।
পল্টন থানার ওই মামলায় বলা হয়েছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা বিনষ্ট করার পাশাপাশি বড় ধরনের ‘অঘটন’ ঘটাতে আসামিরা রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেন এবং সমাবেশ আয়োজনের চেষ্টাও করেন।
সাইদের আইনজীবী প্রশ্ন তুলেছেন, বাকপ্রতিবন্ধী কীভাবে স্লোগান দেবেন? তার ক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহার হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে পুলিশের দাবি, নিষিদ্ধ দলের হয়ে সাইদ মিছিলের সামনে থেকে স্লোগান দিয়েছেন।
গ্রেপ্তারের পর সাইদসহ তিনজনকে ২৫ অগাস্ট আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্টন মডেল থানার এসআই মাকসুদুল হাসান। সেখানে তদন্ত কর্মকর্তা সাইদকে বাকপ্রতিবন্ধী হিসেবে তুলে ধরেন।
ঢাকার মহানগর হাকিম জশিতা ইসলাম তিনজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। অপর দুই আসামি হলেন, রাজু আহমেদ ও শেখ মো. শাকিল।
পরের দিন সাইদের পক্ষে তার আইনজীবী জামিন চেয়ে আবেদন করেন। তারা তাকে প্রতিবন্ধী দাবি করে জামিন চান। আদালত বৃহস্পতিবার শুনানির দিন নির্ধারণ করেন।
এর মধ্যে বুধবার শুনানির আগের দিন তদন্ত কর্মকর্তা মাকসুদুল হাসান সাইদকে প্রতিবন্ধী হিসেবে বিবেচনা না করে তোতলা বা অস্পষ্টভাষী হিসেবে বিবেচনা করার আবেদন করেন। আবেদনে তিনি বলেন, সাইদকে বাকপ্রতিবন্ধী হিসেবে ২৫ অগাস্ট আদালতে পাঠানো হয়। পরে তদন্ত করে জানা যায়, আসামি প্রকৃতপক্ষে বাক প্রতিবন্ধ নন। প্রতিবন্ধী হিসেবে কোনো দালিলিক সাক্ষ্যপ্রমাণও মেলেনি।
আদালত এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তার উপস্থিতিতে শুনানির দিন নির্ধারণ করেন বৃহস্পতিবার।
বৃহস্পতিবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মাকসুদুল হাসান আদালতে হাজির হন। কারাগার থেকে হাজির করা হয় সাইদকেও।
শুনানিতে ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জাকির হোসাইন আদেশ দেন, সাইদ প্রতিবন্ধী কিনা, সে বিষয়ে জেল কোডের বিধান অনুযায়ী একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা পরীক্ষা করে ১ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে সিনিয়র জেল সুপারকে এ আদেশ দেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মাকসুদুল হাসান বলেন, “সাইদের স্পষ্ট কথা বলার ফুটেজ আছে। তবে মুখে জড়তা আছে। জড়তা প্রতিবন্ধীর কাতারে পড়ে কিনা, আদালত সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত চেয়েছেন।”
তিনি বলেন, “নিষিদ্ধ দলের হয়ে মিছিলে সামনে থেকে হাত তুলে স্লোগান দিয়েছে সে। ঘটনাস্থল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সে আমাদের অসহযোগিতা করেছে। নাম-ঠিকানা ঠিকমত বলছিল না, প্রতিবন্ধী বোঝাতে চেয়েছিল। মামলার তদন্ত চলছে। তদন্তে সব জানা যাবে।”
দুই ভাই আর এক বোনের মধ্যে সাইদ সবার বড়।
মুন্সিগঞ্জের খাসহাটে বাবা-মায়ের কাছে না থেকে নানি এবং মামার সঙ্গে নারায়নগঞ্জের পাগলায় থাকত ২২ বছর বয়সী সাইদ। সেখান থেকে কীভাবে গুলিস্তানে এল, তা বুঝতে পারছে না পরিবার। তবে মাঝেমধ্যে একা একা সে অনেক জায়গায় চলে যেত বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
সাইদের মা সুমি বলেন, “ও হাত দিয়ে নিজে ভাত খেতে পারে না। কোনো কাজ নিজে করতে পারে না। দৌড়াতে গেলে পড়ে যায়; কথাও ভালো বোঝা যায় না। ওর মত একটা প্রতিবন্ধী ছেলে জেলে আছে; টেনশন হচ্ছে। কীভাবে কী করতেছে! একদিন জেলেখানায় দেখা করতে গিয়ে শুনেছি, জেলখানায় কিছু খায়নি। আমরা পুরো পরিবার দুশ্চিন্তায় আছি। আমার প্রতিবন্ধী ছেলেটার মুক্তি চাই।”
তিনি বলেন, “ও মাঝেমধ্যে কাউকে কিছু না বলে এখানে-ওখানে চলে যায়; খুঁজে পাওয়া যায় না। নারায়ণগঞ্জ থেকে কীভাবে ঢাকায় গেল আমরা জানি না। হয়ত এলাকার পোলাপাইনের সঙ্গে চলে গিয়েছিল।”
সাইদের মামা সুমন বলেন, “জন্মের পর থেকে ছেলেটা আমাদের কাছে। বাবা-মায়ের কাছে থাকে না। ডাক্তার বলছে ওকে ছেড়ে দিতে। এতে হয়ত ও একটু স্বাভাবিক হবে। ও প্রতিবন্ধী, রাজনীতি বোঝে না। প্রতিবন্ধী ছেলেটা জেলখানায়। আমরা ওর মুক্তি চাই। যে নিজের কাজটা নিজে করতে পারে না, সে কীভাবে রাজনীতি করবে?”
সাইদের আইনজীবী মোহাম্মদ লিটন মিয়া বলেন, “পুলিশ বলছে, সাইদ আওয়ামী লীগের মিছিলে অংশগ্রহণ করেছে। সে তো বাকপ্রতিবন্ধী। আমরা যতটুকু জানি, ওকে পথ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
তার আরেক আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী বলেন, “দেশে আইনের প্রয়োগটা আর নেই। একজন বাকপ্রতিবন্ধীকে রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে মিছিল করেছে, স্লোগান দিয়েছে। বাক প্রতিবন্ধী স্লোগান দেবে কীভাবে। সাইদের ক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহার হয়েছে।’
নিঝুম আহমেদ – জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : বিডিপলিটিক্স টোয়েন্টিফোর ডটকম