০৭:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ নাকি এটা ‘নতুন কিছু নয়’

Farzana Binte Hossain
  • আপডেট সময় ০৫:২৯:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৩ বার পড়া হয়েছে

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে জারি করা অধ্যাদেশটি সংসদে বিল আকারে পাসের মাধ্যমে আইনে পরিণত করায় অনেকটাই হতাশ হয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের ব্যাপারে কিছুটা হলেও নমনীয় হবে এবং রাজনীতিতে ফেরার একটা সুযোগ তৈরি হবে– দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে এমন আশা ছিল।

কিন্তু বিল পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ আইনে রূপ দেওয়ায় এই মুহূর্তে কোনো আশা দেখছেন না তারা। আবার দলটির কোনো কোনো নেতা সংসদে বিল পাসের এ ঘটনাটাকে ‘নতুন কিছু নয়’ বলে মনে করছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঠে নামতে দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

সংসদে বিল পাস হওয়ায় সেই নিষেধাজ্ঞা বহালই থাকছে। তাই বিল পাসের আগের ও পরের অবস্থার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখছেন না আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
তাছাড়া এই মুহূর্তে দলটি কী করবে বা দলের নেতাকর্মীদের প্রতি দিকনির্দেশনা কী হবে, সে বিষয়েও কেউ কিছু বলতে পারছেন না। সবমিলিয়ে একরকম ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপরই নির্বাচন কমিশন থেকে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়। তবে এর আগে থেকেই অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটি ব্যাপক চাপের মধ্যে পড়ে। দলের সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দলটির শীর্ষ স্থানীয় নেতা, মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা দেশ থেকে পালিয়ে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। আত্মগোপনে চলে যান সব স্তরের নেতাকর্মীরা। তখন থেকে আওয়ামী লীগের যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারেনি আওয়ামী লীগ।

তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসায় রাজনৈতিক সরকারের সময় আওয়ামী লীগ মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে– এমনটা আশা করছিল দলটির নেতাকর্মীরা। যার ফলে নির্বাচনের পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দলীয় কার্যালয় খোলার চেষ্টা করতে দেখা গিয়েছিল।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের ধারণা ছিল বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে তাদের রাজনীতিতে ফেরার পথ তুলনামূলকভাবে হয়তো সহজ হবে। বিএনপি সরকারের কাছ থেকে তারা হয়তো কিছুটা রাজনৈতিক ছাড় পাবে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন কারণে আওয়ামী লীগের ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা আলোচনা আছে। বিএনপিকে ভোট দেওয়ার পেছনে কিছু রাজনৈতিক হিসাবনিকাশও কাজ করেছে বলে মনে করা হয়। সঙ্গত কারণেই দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিক ছাড় পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়। তারা আশা করেছিলেন, রাজনৈতিক সরকারের সময় হয়ত রাজনীতির মাঠে ফিরতে পারবেন।

তবে এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি সংসদে বিল আকারে পাস করেছে বিএনপি সরকার। ফলে আওয়ামী লীগের মিছিল, মিটিং, সমাবেশ ও প্রচারণাসহ যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা একরকম স্থায়ী রূপ নিয়েছে। এতে অনেকটাই হতাশ হয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে যারা এখনো দেশে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন কিংবা মামলা রয়েছে, তাদের মধ্যে এই হতাশাটা বেশি। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিল সংসদে পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনের পর যে হিসাব তারা করে আসছিলেন বা যে সম্ভাবনা দেখছিলেন সেটা পাল্টে গেছে। সবমিলিয়ে নতুন করে আবারও বেকায়দায় পড়তে হয়েছে তাদের। ফলে সহসাই রাজনীতিতে ফেরার কোনো সম্ভাবনা তারা এই মুহূর্তে দেখছেন না।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ছিল একটি অনির্বাচিত সরকার। ওই সরকারের রাজনীতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখাই ছিল ওই সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার একটি নির্বাচিত সরকার, একটি রাজনৈতিক দলের সরকার। আমাদের দলের নেতাকর্মীরা ভেবেছিল রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে, এখন হয়তো কিছুটা পরিবর্তন আসবে। অন্তত আমরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর ছাড়টা পাব। কিন্তু এই সরকারও আগের অনির্বাচিত সরকারের পথ অনুসরণ করে চলেছে, দেখা যাক কি হয়।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে বিভিন্ন সময়ে বলেছে, তারা রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হওয়ার পক্ষে নয়। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ আইনে রূপ দিলো। আসলে তারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ভোট পাওয়ার জন্য তখন এ কথা বলেছিল। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা তো তাদের ভোট দিয়েছে।

দেশে এর আগেও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথমেই নিষিদ্ধ হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময় দলটি আবারও নিষিদ্ধ হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর দলটি রাজনীতিতে ফিরে আসে। জামায়াতে ইসলামী ১৯৫৩ সালে নিষিদ্ধ হয়। বছরখানেকের মধ্যে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। ১৯৬১ সালে দলটি আবার নিষিদ্ধ হয়। আবার রাজনীতিতে ফিরে আসে ১৯৬৫ সালে।

১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার আওয়ামী লীগ ও ওয়ালি খানের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নিষিদ্ধ করে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রজনতার আন্দোলনের সময় ১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে। এরপর ২৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপন বাতিল করে। এরপর সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১২ মে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। গত ৮ এপ্রিল ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাসের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সেই অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হয়েছে।

তবে অতীতে নিষিদ্ধ হওয়া সব দল পরবর্তীতে পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস করে আইনে পরিণত করার ঘটনাটাকে নতুন কোনো বিষয় হিসেবে দেখছেন না বা মনে করছেন না। তাদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঠে নামতে দেওয়া হয়নি। পরে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রাখে। সংসদে বিল পাসের পর আগের সেই নিষেধাজ্ঞাই বজায় থাকছে। এ অবস্থায় বিল পাসের আগের ও পরের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। বিএনপি সরকারের এ অবস্থানকে তারা স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন, নতুন কোনো সংকট হিসেবে দেখছেন না।

তবে এ অবস্থায় দলটির রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী এবং দলটি কী ভাবছে, সে বিষয়ে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। রাজনীতিতে ফিরে আসতে আওয়ামী লীগ কী করবে বা কী পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়েও কেউ কিছু জানেন না। এ বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের জন্য কী নির্দেশনা, তাও জানা নেই কারো। এমনকি দলের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারাও এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের এক নেতা বলেন, দল থেকে কোনো নির্দেশনা নেই। এই মুহূর্তে দল কী করবে সে ব্যাপারে কিছু জানি না। কেন্দ্রীয় নেতারাও কিছু বলছেন না। আগে যে অবস্থা ছিল সেই অবস্থাতেই আছি।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এখন কী হবে, কী করতে হবে, কী নির্দেশনা দেওয়া হবে– এ বিষয়ে আমিও কিছু জানি না। কিছুই বলতে পারছি না, দেখি কি হয়।

বিডি পলিটিক্স ২৪ ডটকম

ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ নাকি এটা ‘নতুন কিছু নয়’

আপডেট সময় ০৫:২৯:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে জারি করা অধ্যাদেশটি সংসদে বিল আকারে পাসের মাধ্যমে আইনে পরিণত করায় অনেকটাই হতাশ হয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের ব্যাপারে কিছুটা হলেও নমনীয় হবে এবং রাজনীতিতে ফেরার একটা সুযোগ তৈরি হবে– দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে এমন আশা ছিল।

কিন্তু বিল পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ আইনে রূপ দেওয়ায় এই মুহূর্তে কোনো আশা দেখছেন না তারা। আবার দলটির কোনো কোনো নেতা সংসদে বিল পাসের এ ঘটনাটাকে ‘নতুন কিছু নয়’ বলে মনে করছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঠে নামতে দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

সংসদে বিল পাস হওয়ায় সেই নিষেধাজ্ঞা বহালই থাকছে। তাই বিল পাসের আগের ও পরের অবস্থার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখছেন না আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
তাছাড়া এই মুহূর্তে দলটি কী করবে বা দলের নেতাকর্মীদের প্রতি দিকনির্দেশনা কী হবে, সে বিষয়েও কেউ কিছু বলতে পারছেন না। সবমিলিয়ে একরকম ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপরই নির্বাচন কমিশন থেকে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়। তবে এর আগে থেকেই অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটি ব্যাপক চাপের মধ্যে পড়ে। দলের সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দলটির শীর্ষ স্থানীয় নেতা, মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা দেশ থেকে পালিয়ে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। আত্মগোপনে চলে যান সব স্তরের নেতাকর্মীরা। তখন থেকে আওয়ামী লীগের যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারেনি আওয়ামী লীগ।

তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসায় রাজনৈতিক সরকারের সময় আওয়ামী লীগ মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে– এমনটা আশা করছিল দলটির নেতাকর্মীরা। যার ফলে নির্বাচনের পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দলীয় কার্যালয় খোলার চেষ্টা করতে দেখা গিয়েছিল।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের ধারণা ছিল বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে তাদের রাজনীতিতে ফেরার পথ তুলনামূলকভাবে হয়তো সহজ হবে। বিএনপি সরকারের কাছ থেকে তারা হয়তো কিছুটা রাজনৈতিক ছাড় পাবে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন কারণে আওয়ামী লীগের ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা আলোচনা আছে। বিএনপিকে ভোট দেওয়ার পেছনে কিছু রাজনৈতিক হিসাবনিকাশও কাজ করেছে বলে মনে করা হয়। সঙ্গত কারণেই দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিক ছাড় পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়। তারা আশা করেছিলেন, রাজনৈতিক সরকারের সময় হয়ত রাজনীতির মাঠে ফিরতে পারবেন।

তবে এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি সংসদে বিল আকারে পাস করেছে বিএনপি সরকার। ফলে আওয়ামী লীগের মিছিল, মিটিং, সমাবেশ ও প্রচারণাসহ যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা একরকম স্থায়ী রূপ নিয়েছে। এতে অনেকটাই হতাশ হয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে যারা এখনো দেশে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন কিংবা মামলা রয়েছে, তাদের মধ্যে এই হতাশাটা বেশি। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিল সংসদে পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনের পর যে হিসাব তারা করে আসছিলেন বা যে সম্ভাবনা দেখছিলেন সেটা পাল্টে গেছে। সবমিলিয়ে নতুন করে আবারও বেকায়দায় পড়তে হয়েছে তাদের। ফলে সহসাই রাজনীতিতে ফেরার কোনো সম্ভাবনা তারা এই মুহূর্তে দেখছেন না।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ছিল একটি অনির্বাচিত সরকার। ওই সরকারের রাজনীতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখাই ছিল ওই সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার একটি নির্বাচিত সরকার, একটি রাজনৈতিক দলের সরকার। আমাদের দলের নেতাকর্মীরা ভেবেছিল রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে, এখন হয়তো কিছুটা পরিবর্তন আসবে। অন্তত আমরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর ছাড়টা পাব। কিন্তু এই সরকারও আগের অনির্বাচিত সরকারের পথ অনুসরণ করে চলেছে, দেখা যাক কি হয়।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে বিভিন্ন সময়ে বলেছে, তারা রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হওয়ার পক্ষে নয়। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ আইনে রূপ দিলো। আসলে তারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ভোট পাওয়ার জন্য তখন এ কথা বলেছিল। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা তো তাদের ভোট দিয়েছে।

দেশে এর আগেও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথমেই নিষিদ্ধ হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময় দলটি আবারও নিষিদ্ধ হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর দলটি রাজনীতিতে ফিরে আসে। জামায়াতে ইসলামী ১৯৫৩ সালে নিষিদ্ধ হয়। বছরখানেকের মধ্যে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। ১৯৬১ সালে দলটি আবার নিষিদ্ধ হয়। আবার রাজনীতিতে ফিরে আসে ১৯৬৫ সালে।

১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার আওয়ামী লীগ ও ওয়ালি খানের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নিষিদ্ধ করে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রজনতার আন্দোলনের সময় ১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে। এরপর ২৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপন বাতিল করে। এরপর সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১২ মে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। গত ৮ এপ্রিল ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাসের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সেই অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হয়েছে।

তবে অতীতে নিষিদ্ধ হওয়া সব দল পরবর্তীতে পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস করে আইনে পরিণত করার ঘটনাটাকে নতুন কোনো বিষয় হিসেবে দেখছেন না বা মনে করছেন না। তাদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঠে নামতে দেওয়া হয়নি। পরে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রাখে। সংসদে বিল পাসের পর আগের সেই নিষেধাজ্ঞাই বজায় থাকছে। এ অবস্থায় বিল পাসের আগের ও পরের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। বিএনপি সরকারের এ অবস্থানকে তারা স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন, নতুন কোনো সংকট হিসেবে দেখছেন না।

তবে এ অবস্থায় দলটির রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী এবং দলটি কী ভাবছে, সে বিষয়ে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। রাজনীতিতে ফিরে আসতে আওয়ামী লীগ কী করবে বা কী পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়েও কেউ কিছু জানেন না। এ বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের জন্য কী নির্দেশনা, তাও জানা নেই কারো। এমনকি দলের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারাও এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের এক নেতা বলেন, দল থেকে কোনো নির্দেশনা নেই। এই মুহূর্তে দল কী করবে সে ব্যাপারে কিছু জানি না। কেন্দ্রীয় নেতারাও কিছু বলছেন না। আগে যে অবস্থা ছিল সেই অবস্থাতেই আছি।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এখন কী হবে, কী করতে হবে, কী নির্দেশনা দেওয়া হবে– এ বিষয়ে আমিও কিছু জানি না। কিছুই বলতে পারছি না, দেখি কি হয়।

বিডি পলিটিক্স ২৪ ডটকম