১১:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

সচিবালয় থেকে সংসদ, আলোচনায় জ্বালানি সংকট

নিজস্ব সংবাদ দাতা
  • আপডেট সময় ০৯:১৯:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
  • / ১২ বার পড়া হয়েছে

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল মজুত রয়েছে।

দেশে জ্বালানি ঘাটতি নেই, পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে—সরকারের এমন আশ্বাসের মধ্যেই পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, সংসদে বিরোধী দলীয় এমপির তেল না পাওয়ার অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ মজুতের ঘটনা; সব মিলিয়ে জ্বালানি ইস্যু এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

সোমবার (৩০ মার্চ) সচিবালয়ে এক সভা শেষে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। কৃষিখাতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল মজুত রয়েছে।

এছাড়া চলতি সপ্তাহেই আরও ৫৪ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন ডিজেল দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এপ্রিল মাসে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আরও ১ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন তেল আমদানি হওয়ার আশা করা হচ্ছে। রাশিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
সোমবার জাতীয় সংসদে কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তিনি নিজেই পাম্প ঘুরে গাড়ির জন্য তেল পাননি।

তার এ বক্তব্যকে সমর্থন করে আরেক সংসদ সদস্য জানান, অনেক এলাকায় পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না, যদিও বোতলে করে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির ঘটনা ঘটছে।
এ দিন সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশে প্রকৃত কোনো জ্বালানি সংকট নেই; বরং অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুত প্রবণতার কারণে কৃত্রিম চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, দেশের মোট ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল, যার সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। অন্যদিকে পেট্রোল ও অকটেনের ব্যবহার তুলনামূলক কম হলেও হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছু স্থানে চাপ তৈরি হয়েছে।

মন্ত্রী আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাবের কথাও উল্লেখ করে বলেন, সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি বাড়ানো হচ্ছে।

সিন্ডিকেটের কারসাজির অভিযোগ
জ্বালানি সংকটের পেছনে সংগঠিত সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য দুটি সক্রিয় চক্র কাজ করছে; একটি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক, অন্যটি ঢাকাকেন্দ্রিক সরবরাহ ও বিতরণ সিন্ডিকেট।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে তেল পরিবহনের সময় ট্যাংক লরি থেকে তেল চুরি, ডিপো পর্যায়ে কারসাজি এবং খুচরা পর্যায়ে মজুত করে সরবরাহ বন্ধ রাখার মাধ্যমে বাজারে অস্বাভাবিক সংকট তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে দাম বাড়ার গুঞ্জন ছড়ালেই অনেক পাম্পে ‘সাপ্লাই নেই’ দেখিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযান ও জব্দের ঘটনা
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ধরতে সারা দেশে অভিযান চালাচ্ছে সরকার। ৩ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৬৪ জেলায় মোট ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে অবৈধভাবে মজুত করা ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।

সোমবারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন দেশব্যাপী অভিযান চালিয়েছে। রাজধানীর গুলশান, খিলখেত ও ভাটারা এলাকায় যৌথ অভিযানে প্রায় ১২০০ লিটার ডিজেল ও পেট্রোল জব্দ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ ঘটনায় সাতজনকে আটক করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম, জামালপুর, শেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার লিটার জ্বালানি অবৈধভাবে মজুত অবস্থায় জব্দের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও পাম্পে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও বিক্রি বন্ধ রাখার প্রমাণও মিলেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে ইতোমধ্যে তিন হাজারের বেশি অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি উদ্ধার, মামলা, জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস থাকলেও অবৈধ মজুত, সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং কৃত্রিম চাহিদা—এসব বাস্তবতায় দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি এখন জটিল রূপ নিয়েছে।

বিডি পলিটিক্স/বিইউ

ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

সচিবালয় থেকে সংসদ, আলোচনায় জ্বালানি সংকট

আপডেট সময় ০৯:১৯:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

দেশে জ্বালানি ঘাটতি নেই, পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে—সরকারের এমন আশ্বাসের মধ্যেই পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, সংসদে বিরোধী দলীয় এমপির তেল না পাওয়ার অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ মজুতের ঘটনা; সব মিলিয়ে জ্বালানি ইস্যু এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

সোমবার (৩০ মার্চ) সচিবালয়ে এক সভা শেষে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। কৃষিখাতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল মজুত রয়েছে।

এছাড়া চলতি সপ্তাহেই আরও ৫৪ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন ডিজেল দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এপ্রিল মাসে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আরও ১ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন তেল আমদানি হওয়ার আশা করা হচ্ছে। রাশিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
সোমবার জাতীয় সংসদে কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তিনি নিজেই পাম্প ঘুরে গাড়ির জন্য তেল পাননি।

তার এ বক্তব্যকে সমর্থন করে আরেক সংসদ সদস্য জানান, অনেক এলাকায় পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না, যদিও বোতলে করে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির ঘটনা ঘটছে।
এ দিন সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশে প্রকৃত কোনো জ্বালানি সংকট নেই; বরং অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুত প্রবণতার কারণে কৃত্রিম চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, দেশের মোট ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল, যার সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। অন্যদিকে পেট্রোল ও অকটেনের ব্যবহার তুলনামূলক কম হলেও হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছু স্থানে চাপ তৈরি হয়েছে।

মন্ত্রী আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাবের কথাও উল্লেখ করে বলেন, সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি বাড়ানো হচ্ছে।

সিন্ডিকেটের কারসাজির অভিযোগ
জ্বালানি সংকটের পেছনে সংগঠিত সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য দুটি সক্রিয় চক্র কাজ করছে; একটি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক, অন্যটি ঢাকাকেন্দ্রিক সরবরাহ ও বিতরণ সিন্ডিকেট।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে তেল পরিবহনের সময় ট্যাংক লরি থেকে তেল চুরি, ডিপো পর্যায়ে কারসাজি এবং খুচরা পর্যায়ে মজুত করে সরবরাহ বন্ধ রাখার মাধ্যমে বাজারে অস্বাভাবিক সংকট তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে দাম বাড়ার গুঞ্জন ছড়ালেই অনেক পাম্পে ‘সাপ্লাই নেই’ দেখিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযান ও জব্দের ঘটনা
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ধরতে সারা দেশে অভিযান চালাচ্ছে সরকার। ৩ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৬৪ জেলায় মোট ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে অবৈধভাবে মজুত করা ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।

সোমবারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন দেশব্যাপী অভিযান চালিয়েছে। রাজধানীর গুলশান, খিলখেত ও ভাটারা এলাকায় যৌথ অভিযানে প্রায় ১২০০ লিটার ডিজেল ও পেট্রোল জব্দ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ ঘটনায় সাতজনকে আটক করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম, জামালপুর, শেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার লিটার জ্বালানি অবৈধভাবে মজুত অবস্থায় জব্দের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও পাম্পে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও বিক্রি বন্ধ রাখার প্রমাণও মিলেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে ইতোমধ্যে তিন হাজারের বেশি অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি উদ্ধার, মামলা, জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস থাকলেও অবৈধ মজুত, সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং কৃত্রিম চাহিদা—এসব বাস্তবতায় দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি এখন জটিল রূপ নিয়েছে।

বিডি পলিটিক্স/বিইউ