০৮:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে লিটনের রাজকীয় সেঞ্চুরি

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
  • আপডেট সময় ০৫:৫১:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
  • / ২ বার পড়া হয়েছে

সেঞ্চুরি ছুঁয়েই খুররম শাহজাদের বলে ফাইন লেগ দিয়ে বিশাল ছক্কা হাঁকালেন লিটন দাস। পুরো ইনিংসজুড়েই পাকিস্তানের বোলারদের নিয়ে যেন ছেলেখেলায় মেতেছিলেন তিনি।

তিন বোলার তাইজুল, তাসকিন ও শরিফুলকে পাশে রেখে যেভাবে আগ্রাসী ব্যাটিং করেছেন, সেটি দেখে যে কেউ ওয়ানডে ভেবে ভুল করতে পারেন! লিটন যখন ক্রিজে ছিলেন, তখন ফিল্ড সেটআপও হয়ে গিয়েছিল ওয়ানডের মেজাজে। তবুও যেন তার বাউন্ডারি আটকানো যাচ্ছিল না।

তিন বোলারকে এক পাশে রেখে তুলে নেন ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরি। তার এই অনবদ্য ইনিংসেই বিপর্যয় কাটিয়ে ২৭৮ রান তোলে বাংলাদেশ!
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চাপ, ধ্বংসস্তূপ আর হতাশার মাঝেও নিজের ব্যাটে আলো ছড়িয়েছেন লিটন।

একের পর এক উইকেট পতনের দিনে বাংলাদেশের হয়ে একাই লড়ে গেলেন এই ডানহাতি ব্যাটার। আর সেই লড়াইকে পূর্ণতা দিলেন দারুণ এক টেস্ট সেঞ্চুরিতে।

খুররম শাহজাদের করা ৭০তম ওভারে যেন নিজের ইনিংসের সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট করে তুললেন তিনি। ওভারের দ্বিতীয় বলে অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে ফুল লেংথ ডেলিভারিকে ব্যাটের পুরো মুখ ব্যবহার করে কভার দিয়ে চার তুলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি তার তৃতীয় শতক।

তবে সেঞ্চুরির পরও থামেননি লিটন। পরের বলেই খুররমের শর্ট অব লেংথ ডেলিভারিকে ফাইন লেগের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারেন বিশাল ছক্কা। ব্যাট হাতে যেন আলাদা এক ছন্দে খেলছিলেন বাংলাদেশের এই উইকেটকিপার ব্যাটার। মারার বলগুলো আত্মবিশ্বাসে সীমানাছাড়া করেছেন, আর ছাড়ার বলগুলো ছেড়েছেন নিখুঁত ধৈর্যে। ইনিংসজুড়ে ছিল নিয়ন্ত্রণ, পরিপক্বতা আর দায়িত্ববোধের ছাপ।

১১৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর ধারণা করা হচ্ছিল, দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে বাংলাদেশের ইনিংস। ষষ্ঠ উইকেট হিসেবে মেহেদী হাসান মিরাজ যখন আউট হন, তখন লিটনের রান ছিল মাত্র ২। এরপর সপ্তম উইকেটে তাইজুলের সঙ্গে ১১৪ বলে ৬০ রানের জুটি গড়েন তিনি। তাইজুল ৪০ বলে ১৬ রান করলেও লিটনকে যোগ্য সঙ্গ দেন।

তাইজুলের আউটের পর দায়িত্ব তুলে নেন তাসকিন। ৪২ বলে দ্রুত ৩৮ রানের জুটি গড়েন তাসকিন ও লিটন। তাসকিনের আউটের পর শরিফুলকে নিয়ে ভিন্ন পরিকল্পনায় এগোতে থাকেন লিটন। শুরুতে যতটা সম্ভব শরিফুলকে কম স্ট্রাইকে রাখার চেষ্টা করে খেলতে থাকেন তিনি। পাশে শরিফুলকে রেখেই ছুঁয়ে ফেলেন সেঞ্চুরি। এরপর শুরু করেন টি-টোয়েন্টি মেজাজে ব্যাটিং। সেটি করতে গিয়েই হাসান আলীর বলে সাজঘরে ফিরতে হয় তাকে।

হাসান আলীর বল দেখে নিজের স্বভাবসুলভ পুল খেলতে গিয়েছিলেন লিটন। কিন্তু এবার ঠিকমতো টাইমিং হলো না। ব্যাটের ভেতরের অংশে লেগে বল উড়ে যায় ডিপ স্কয়ার লেগের দিকে। দারুণ এক ডাইভে ক্যাচটি তালুবন্দি করেন আব্দুল্লাহ ফজল। আম্পায়াররা ক্যাচটি পরিষ্কারভাবে ধরা হয়েছে কি না, সেটি পরীক্ষা করতে গেলেও লিটন তখন ধীর পায়ে হাঁটা শুরু করেছেন ড্রেসিংরুমের পথে। যেন বুঝেই গিয়েছিলেন, তার অসাধারণ ইনিংসের সমাপ্তি হয়ে গেছে!

লিটন ফেরার সময় আরেকটি সুন্দর দৃশ্যও দেখা গেল। হাসান আলী এগিয়ে এসে হাত মেলালেন, পিঠ চাপড়ে দিলেন বাংলাদেশের ব্যাটারকে। প্রতিপক্ষের একজন ক্রিকেটারের কাছ থেকেও এমন সম্মানই বলে দেয়, কতটা বিশেষ ছিল লিটনের এই ইনিংস।

আজকের ইনিংসের মাধ্যমে আরেকটি বড় মাইলফলকও ছুঁয়েছেন লিটন। আইসিসি স্বীকৃত ক্রিকেটে পূর্ণ করেছেন ২০ হাজার রানের মাইলফলক। তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটে ১৯ হাজার ৯৭৫ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নেমেছিলেন তিনি। শুক্রবার সেঞ্চুরি করার পথেই পৌঁছে যান ২০ হাজার রানের ক্লাবে। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ১৯৭ ম্যাচ খেলে লিটনের রান ৬ হাজার ৩৬৮। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ২৭০ ম্যাচে তার রান ৬ হাজার ১৩৫। আর ১০১টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তার সংগ্রহ এখন ৭ হাজার ৫৯৮ রান।

সব মিলিয়ে লিটনের বর্তমান রান ২০ হাজার ১০১। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এটি নিঃসন্দেহে বড় এক অর্জন। আর এমন একটি দিনে, যখন দলের অন্য ব্যাটাররা ব্যর্থ, তখন নিজের মাইলফলক স্পর্শ করেও দলকে টেনে নেওয়ার দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনিই।

লিটনের ব্যাটেই প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ২৭৮ রানের সংগ্রহ দাঁড় করাতে পেরেছে। টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডারের ব্যর্থতার দিনে লিটন যেভাবে জ্বলে উঠলেন, তাতে পুরো ড্রেসিংরুমেই নিশ্চিতভাবে আত্মবিশ্বাসের হাওয়া ছড়িয়ে গেছে। লিটনের ব্যাটে যে রান উঠেছে, সেটি মোটেও সহজ কোনো লক্ষ্য নয়।

সিলেটের উইকেটে প্রথম দিনে ব্যাটিং করাটা কিছুটা কঠিন। সেই জায়গা থেকে ২৭৮ রান ভালো সংগ্রহ। এখন বোলাররা নিজেদের দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করতে পারলেই প্রথম দিনটি নিজেদের করে নিতে পারবে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।

ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে লিটনের রাজকীয় সেঞ্চুরি

আপডেট সময় ০৫:৫১:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

সেঞ্চুরি ছুঁয়েই খুররম শাহজাদের বলে ফাইন লেগ দিয়ে বিশাল ছক্কা হাঁকালেন লিটন দাস। পুরো ইনিংসজুড়েই পাকিস্তানের বোলারদের নিয়ে যেন ছেলেখেলায় মেতেছিলেন তিনি।

তিন বোলার তাইজুল, তাসকিন ও শরিফুলকে পাশে রেখে যেভাবে আগ্রাসী ব্যাটিং করেছেন, সেটি দেখে যে কেউ ওয়ানডে ভেবে ভুল করতে পারেন! লিটন যখন ক্রিজে ছিলেন, তখন ফিল্ড সেটআপও হয়ে গিয়েছিল ওয়ানডের মেজাজে। তবুও যেন তার বাউন্ডারি আটকানো যাচ্ছিল না।

তিন বোলারকে এক পাশে রেখে তুলে নেন ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরি। তার এই অনবদ্য ইনিংসেই বিপর্যয় কাটিয়ে ২৭৮ রান তোলে বাংলাদেশ!
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চাপ, ধ্বংসস্তূপ আর হতাশার মাঝেও নিজের ব্যাটে আলো ছড়িয়েছেন লিটন।

একের পর এক উইকেট পতনের দিনে বাংলাদেশের হয়ে একাই লড়ে গেলেন এই ডানহাতি ব্যাটার। আর সেই লড়াইকে পূর্ণতা দিলেন দারুণ এক টেস্ট সেঞ্চুরিতে।

খুররম শাহজাদের করা ৭০তম ওভারে যেন নিজের ইনিংসের সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট করে তুললেন তিনি। ওভারের দ্বিতীয় বলে অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে ফুল লেংথ ডেলিভারিকে ব্যাটের পুরো মুখ ব্যবহার করে কভার দিয়ে চার তুলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি তার তৃতীয় শতক।

তবে সেঞ্চুরির পরও থামেননি লিটন। পরের বলেই খুররমের শর্ট অব লেংথ ডেলিভারিকে ফাইন লেগের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারেন বিশাল ছক্কা। ব্যাট হাতে যেন আলাদা এক ছন্দে খেলছিলেন বাংলাদেশের এই উইকেটকিপার ব্যাটার। মারার বলগুলো আত্মবিশ্বাসে সীমানাছাড়া করেছেন, আর ছাড়ার বলগুলো ছেড়েছেন নিখুঁত ধৈর্যে। ইনিংসজুড়ে ছিল নিয়ন্ত্রণ, পরিপক্বতা আর দায়িত্ববোধের ছাপ।

১১৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর ধারণা করা হচ্ছিল, দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে বাংলাদেশের ইনিংস। ষষ্ঠ উইকেট হিসেবে মেহেদী হাসান মিরাজ যখন আউট হন, তখন লিটনের রান ছিল মাত্র ২। এরপর সপ্তম উইকেটে তাইজুলের সঙ্গে ১১৪ বলে ৬০ রানের জুটি গড়েন তিনি। তাইজুল ৪০ বলে ১৬ রান করলেও লিটনকে যোগ্য সঙ্গ দেন।

তাইজুলের আউটের পর দায়িত্ব তুলে নেন তাসকিন। ৪২ বলে দ্রুত ৩৮ রানের জুটি গড়েন তাসকিন ও লিটন। তাসকিনের আউটের পর শরিফুলকে নিয়ে ভিন্ন পরিকল্পনায় এগোতে থাকেন লিটন। শুরুতে যতটা সম্ভব শরিফুলকে কম স্ট্রাইকে রাখার চেষ্টা করে খেলতে থাকেন তিনি। পাশে শরিফুলকে রেখেই ছুঁয়ে ফেলেন সেঞ্চুরি। এরপর শুরু করেন টি-টোয়েন্টি মেজাজে ব্যাটিং। সেটি করতে গিয়েই হাসান আলীর বলে সাজঘরে ফিরতে হয় তাকে।

হাসান আলীর বল দেখে নিজের স্বভাবসুলভ পুল খেলতে গিয়েছিলেন লিটন। কিন্তু এবার ঠিকমতো টাইমিং হলো না। ব্যাটের ভেতরের অংশে লেগে বল উড়ে যায় ডিপ স্কয়ার লেগের দিকে। দারুণ এক ডাইভে ক্যাচটি তালুবন্দি করেন আব্দুল্লাহ ফজল। আম্পায়াররা ক্যাচটি পরিষ্কারভাবে ধরা হয়েছে কি না, সেটি পরীক্ষা করতে গেলেও লিটন তখন ধীর পায়ে হাঁটা শুরু করেছেন ড্রেসিংরুমের পথে। যেন বুঝেই গিয়েছিলেন, তার অসাধারণ ইনিংসের সমাপ্তি হয়ে গেছে!

লিটন ফেরার সময় আরেকটি সুন্দর দৃশ্যও দেখা গেল। হাসান আলী এগিয়ে এসে হাত মেলালেন, পিঠ চাপড়ে দিলেন বাংলাদেশের ব্যাটারকে। প্রতিপক্ষের একজন ক্রিকেটারের কাছ থেকেও এমন সম্মানই বলে দেয়, কতটা বিশেষ ছিল লিটনের এই ইনিংস।

আজকের ইনিংসের মাধ্যমে আরেকটি বড় মাইলফলকও ছুঁয়েছেন লিটন। আইসিসি স্বীকৃত ক্রিকেটে পূর্ণ করেছেন ২০ হাজার রানের মাইলফলক। তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটে ১৯ হাজার ৯৭৫ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নেমেছিলেন তিনি। শুক্রবার সেঞ্চুরি করার পথেই পৌঁছে যান ২০ হাজার রানের ক্লাবে। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ১৯৭ ম্যাচ খেলে লিটনের রান ৬ হাজার ৩৬৮। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ২৭০ ম্যাচে তার রান ৬ হাজার ১৩৫। আর ১০১টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তার সংগ্রহ এখন ৭ হাজার ৫৯৮ রান।

সব মিলিয়ে লিটনের বর্তমান রান ২০ হাজার ১০১। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এটি নিঃসন্দেহে বড় এক অর্জন। আর এমন একটি দিনে, যখন দলের অন্য ব্যাটাররা ব্যর্থ, তখন নিজের মাইলফলক স্পর্শ করেও দলকে টেনে নেওয়ার দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনিই।

লিটনের ব্যাটেই প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ২৭৮ রানের সংগ্রহ দাঁড় করাতে পেরেছে। টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডারের ব্যর্থতার দিনে লিটন যেভাবে জ্বলে উঠলেন, তাতে পুরো ড্রেসিংরুমেই নিশ্চিতভাবে আত্মবিশ্বাসের হাওয়া ছড়িয়ে গেছে। লিটনের ব্যাটে যে রান উঠেছে, সেটি মোটেও সহজ কোনো লক্ষ্য নয়।

সিলেটের উইকেটে প্রথম দিনে ব্যাটিং করাটা কিছুটা কঠিন। সেই জায়গা থেকে ২৭৮ রান ভালো সংগ্রহ। এখন বোলাররা নিজেদের দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করতে পারলেই প্রথম দিনটি নিজেদের করে নিতে পারবে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।