০৬:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

মোদী-শি বৈঠক: নতুন অধ্যায়ের সূচনা, নাকি সংঘাত এড়ানোর কৌশল?

মিজানুর রহমান খান - বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় ০৪:২৯:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
  • / ২ বার পড়া হয়েছে

ফাইল ছবি

ভারত ও চীনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা, দুই দেশের নেতাদের বৈঠক এবং সরাসরি যোগাযোগ পুনরায় চালু হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগকে সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন বা নতুন করে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে দুই দেশ সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করলেও সীমান্ত বিরোধ, পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এবং বাণিজ্য ঘাটতির মতো গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য এখনো অমীমাংসিত। গত সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নয়াদিল্লি সফর এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠক নতুন করে আলোচনার জন্ম দিলেও এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কোনো ঘটনা নয়।

গত মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে যান শি জিনপিং। এ সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের সুযোগও তৈরি হয়। এরপর ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের পুনর্গঠন বা নতুন করে ঘনিষ্ঠতা তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ সামনে আসে। কেউ কেউ এটিকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। আবার কারও মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতিই বেইজিংয়ের সঙ্গে নয়াদিল্লির নতুন করে যোগাযোগ বাড়ানোর অন্যতম কারণ। তবে এই দুই ব্যাখ্যাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরিবর্তনকে অতিরঞ্জিত করে। শির সফর গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো যুগান্তকারী মোড় তৈরি করেনি।

ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) মতো বহুপক্ষীয় জোটে ভারত ও চীনের অংশগ্রহণকে দুই দেশের স্বার্থের অভিন্নতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বহুপক্ষীয় সংস্থায় যুক্ত থাকা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের বৈশিষ্ট্য। এ ক্ষেত্রে চীন কোনো নির্ধারক ভূমিকা পালন করেনি।

২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করা এবং মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান বৈরী নীতি, বিশেষ করে ভারত ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতি তার অবস্থানের প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগ আরও গতি পেয়েছে। তবে বেইজিংয়ের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ বাড়ানোর পেছনে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতিই কাজ করছে না।

দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সংলাপ পুনরায় শুরু হওয়া, শীর্ষ নেতাদের বৈঠক এবং সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা চালুর মতো ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। গালওয়ানের মতো আরেকটি সীমান্ত সংঘর্ষ হলে উভয় দেশেই এর বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। এমন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোও কঠিন হতে পারে। তাই নতুন করে সহিংসতা এড়ানো দুই দেশের জন্যই অগ্রাধিকার। তবে সংঘাত এড়ানোর অর্থ এই নয় যে, ভারতকে তার মৌলিক অবস্থান বা বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত কখনোই চীনের সঙ্গে সংলাপ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। সীমান্তে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখার নীতি বজায় রেখেছে নয়াদিল্লি। সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। এগুলো থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধরন কিংবা চীনকে মোকাবিলায় ভারতের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে।

দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান বাধা এখনো সীমান্ত বিরোধ। ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখকে স্বীকৃতি না দেওয়ার বিষয়ে চীনের সাম্প্রতিক বক্তব্য দুই দেশের মতপার্থক্যের গভীরতা আবারও সামনে এনেছে। ভূখণ্ডগত প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থান যখন এতটা দূরত্বে, তখন সম্পর্কের পুনর্গঠনের প্রত্যাশার পক্ষে শক্ত ভিত্তি নেই।

সীমান্ত ছাড়াও চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক এবং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের বিষয়। এসব মৌলিক মতপার্থক্যের কোনোটি সমাধানের পথে এগিয়েছে—এমন প্রমাণও খুব একটা নেই।

মোদি-শি বৈঠকের পর দুই দেশের পক্ষ থেকে প্রকাশিত পৃথক বিবৃতিও পারস্পরিক দূরত্বের বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। বৈঠকের পর কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি। চীনের বিবৃতিতে তিব্বত ও তাইওয়ানের প্রসঙ্গ থাকলেও ভারতের বিবৃতিতে তা উল্লেখ করা হয়নি। বেইজিং ভারতকে অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করলেও নয়াদিল্লির বিবৃতিতে একই ধরনের শব্দচয়ন দেখা যায়নি। দুই পক্ষের বক্তব্যে এমন পার্থক্য অভিন্ন রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ইঙ্গিত দেয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের অঙ্গীকার নিয়ে অনিশ্চয়তা বেইজিংয়ের সঙ্গে নয়াদিল্লির যোগাযোগের পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতেই ভারতের চীননীতি নির্ধারিত হয়—এমন ধারণা ভুল। সীমান্তে নতুন করে সংঘাত এড়ানোর নিজস্ব কারণ ভারতের রয়েছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে বর্তমান টানাপোড়েন শুরুর অনেক আগে থেকেই চীনের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে আসছে নয়াদিল্লি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে ভারত একঘরে হয়ে পড়েছে কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্ব কমে গেছে—এমন ধারণাও আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে উপেক্ষা করে। ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকারে পরিবর্তন এলেও এসব দেশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ থেকেই যায়। আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ; তবে দেশটির অঙ্গীকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া মানেই এ অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া নয়।

ওয়াশিংটনের জন্য তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশটির নীতি আঞ্চলিক মিত্র ও অংশীদারদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমে গেলে তার প্রভাব পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ভারতের নিরাপত্তাস্বার্থ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ওয়াশিংটনের সঙ্গে টানাপোড়েন চললেও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে নয়াদিল্লিকে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত ও চীন পরস্পরের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের পাশাপাশি বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কও নিজস্ব বিবেচনায় পরিচালনা করতে পারে ভারত। একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের গতিপথ অনিবার্যভাবে নির্ধারণ করে না। নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের সঙ্গে আপস না করে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার ভারতের দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গেই চীনের সঙ্গে মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চীন-ভারত সম্পর্ক এখনো ২০২০ সালের আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি। দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা সীমিত এবং ‘হ্যান্ড-ইন-হ্যান্ড’-এর মতো সামরিক মহড়া এখনো বন্ধ রয়েছে। পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। আপাতত দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

ভারতের জন্য অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ এখনো বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ। গালওয়ান সংঘর্ষ চীন সম্পর্কে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ও হুমকি মূল্যায়নে পরিবর্তন এনেছে। একই সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর শান্তি বজায় রাখতে বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সাময়িকভাবে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু সীমান্তের বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতির বিকল্প হতে পারে না।

বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ‘এক ভারত’ নীতি নিয়ে কোনো সমতুল্য অবস্থান বা আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত ভারত তার আগের ‘এক চীন’ নীতিতে ফিরে যাবে—এমন সম্ভাবনাও কম। নিকট ভবিষ্যতে এ ধরনের আশ্বাস পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে হচ্ছে।

মাত্র কয়েক বছর আগেও ভারতের মাটিতে শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হওয়া কঠিন বলে মনে হতো। এ কারণেই তাদের সাম্প্রতিক বৈঠক এতটা মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কিন্তু এই বৈঠক দুই দেশের মধ্যকার বিরোধের পরিধি কিংবা ধরনে কোনো পরিবর্তন আনেনি। আপাতত উভয় পক্ষই নতুন করে সংকট তৈরি হওয়া ঠেকাতে চাইছে, অথচ তাদের মৌলিক মতপার্থক্যগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। এসব বিরোধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সংলাপ হয়তো সম্পর্কের আরও অবনতি ঠেকাতে পারবে, কিন্তু চীন-ভারত সম্পর্ককে নতুন করে ঘনিষ্ঠতার পথে নিয়ে যেতে পারবে না।

তথ্যসূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট।

ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

মোদী-শি বৈঠক: নতুন অধ্যায়ের সূচনা, নাকি সংঘাত এড়ানোর কৌশল?

আপডেট সময় ০৪:২৯:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

ভারত ও চীনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা, দুই দেশের নেতাদের বৈঠক এবং সরাসরি যোগাযোগ পুনরায় চালু হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগকে সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন বা নতুন করে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে দুই দেশ সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করলেও সীমান্ত বিরোধ, পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এবং বাণিজ্য ঘাটতির মতো গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য এখনো অমীমাংসিত। গত সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নয়াদিল্লি সফর এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠক নতুন করে আলোচনার জন্ম দিলেও এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কোনো ঘটনা নয়।

গত মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে যান শি জিনপিং। এ সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের সুযোগও তৈরি হয়। এরপর ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের পুনর্গঠন বা নতুন করে ঘনিষ্ঠতা তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ সামনে আসে। কেউ কেউ এটিকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। আবার কারও মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতিই বেইজিংয়ের সঙ্গে নয়াদিল্লির নতুন করে যোগাযোগ বাড়ানোর অন্যতম কারণ। তবে এই দুই ব্যাখ্যাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরিবর্তনকে অতিরঞ্জিত করে। শির সফর গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো যুগান্তকারী মোড় তৈরি করেনি।

ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) মতো বহুপক্ষীয় জোটে ভারত ও চীনের অংশগ্রহণকে দুই দেশের স্বার্থের অভিন্নতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বহুপক্ষীয় সংস্থায় যুক্ত থাকা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের বৈশিষ্ট্য। এ ক্ষেত্রে চীন কোনো নির্ধারক ভূমিকা পালন করেনি।

২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করা এবং মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান বৈরী নীতি, বিশেষ করে ভারত ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতি তার অবস্থানের প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগ আরও গতি পেয়েছে। তবে বেইজিংয়ের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ বাড়ানোর পেছনে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতিই কাজ করছে না।

দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সংলাপ পুনরায় শুরু হওয়া, শীর্ষ নেতাদের বৈঠক এবং সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা চালুর মতো ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। গালওয়ানের মতো আরেকটি সীমান্ত সংঘর্ষ হলে উভয় দেশেই এর বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। এমন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোও কঠিন হতে পারে। তাই নতুন করে সহিংসতা এড়ানো দুই দেশের জন্যই অগ্রাধিকার। তবে সংঘাত এড়ানোর অর্থ এই নয় যে, ভারতকে তার মৌলিক অবস্থান বা বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত কখনোই চীনের সঙ্গে সংলাপ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। সীমান্তে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখার নীতি বজায় রেখেছে নয়াদিল্লি। সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। এগুলো থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধরন কিংবা চীনকে মোকাবিলায় ভারতের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে।

দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান বাধা এখনো সীমান্ত বিরোধ। ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখকে স্বীকৃতি না দেওয়ার বিষয়ে চীনের সাম্প্রতিক বক্তব্য দুই দেশের মতপার্থক্যের গভীরতা আবারও সামনে এনেছে। ভূখণ্ডগত প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থান যখন এতটা দূরত্বে, তখন সম্পর্কের পুনর্গঠনের প্রত্যাশার পক্ষে শক্ত ভিত্তি নেই।

সীমান্ত ছাড়াও চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক এবং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের বিষয়। এসব মৌলিক মতপার্থক্যের কোনোটি সমাধানের পথে এগিয়েছে—এমন প্রমাণও খুব একটা নেই।

মোদি-শি বৈঠকের পর দুই দেশের পক্ষ থেকে প্রকাশিত পৃথক বিবৃতিও পারস্পরিক দূরত্বের বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। বৈঠকের পর কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি। চীনের বিবৃতিতে তিব্বত ও তাইওয়ানের প্রসঙ্গ থাকলেও ভারতের বিবৃতিতে তা উল্লেখ করা হয়নি। বেইজিং ভারতকে অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করলেও নয়াদিল্লির বিবৃতিতে একই ধরনের শব্দচয়ন দেখা যায়নি। দুই পক্ষের বক্তব্যে এমন পার্থক্য অভিন্ন রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ইঙ্গিত দেয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের অঙ্গীকার নিয়ে অনিশ্চয়তা বেইজিংয়ের সঙ্গে নয়াদিল্লির যোগাযোগের পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতেই ভারতের চীননীতি নির্ধারিত হয়—এমন ধারণা ভুল। সীমান্তে নতুন করে সংঘাত এড়ানোর নিজস্ব কারণ ভারতের রয়েছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে বর্তমান টানাপোড়েন শুরুর অনেক আগে থেকেই চীনের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে আসছে নয়াদিল্লি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে ভারত একঘরে হয়ে পড়েছে কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্ব কমে গেছে—এমন ধারণাও আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে উপেক্ষা করে। ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকারে পরিবর্তন এলেও এসব দেশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ থেকেই যায়। আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ; তবে দেশটির অঙ্গীকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া মানেই এ অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া নয়।

ওয়াশিংটনের জন্য তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশটির নীতি আঞ্চলিক মিত্র ও অংশীদারদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমে গেলে তার প্রভাব পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ভারতের নিরাপত্তাস্বার্থ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ওয়াশিংটনের সঙ্গে টানাপোড়েন চললেও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে নয়াদিল্লিকে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত ও চীন পরস্পরের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের পাশাপাশি বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কও নিজস্ব বিবেচনায় পরিচালনা করতে পারে ভারত। একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের গতিপথ অনিবার্যভাবে নির্ধারণ করে না। নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের সঙ্গে আপস না করে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার ভারতের দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গেই চীনের সঙ্গে মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চীন-ভারত সম্পর্ক এখনো ২০২০ সালের আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি। দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা সীমিত এবং ‘হ্যান্ড-ইন-হ্যান্ড’-এর মতো সামরিক মহড়া এখনো বন্ধ রয়েছে। পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। আপাতত দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

ভারতের জন্য অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ এখনো বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ। গালওয়ান সংঘর্ষ চীন সম্পর্কে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ও হুমকি মূল্যায়নে পরিবর্তন এনেছে। একই সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর শান্তি বজায় রাখতে বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সাময়িকভাবে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু সীমান্তের বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতির বিকল্প হতে পারে না।

বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ‘এক ভারত’ নীতি নিয়ে কোনো সমতুল্য অবস্থান বা আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত ভারত তার আগের ‘এক চীন’ নীতিতে ফিরে যাবে—এমন সম্ভাবনাও কম। নিকট ভবিষ্যতে এ ধরনের আশ্বাস পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে হচ্ছে।

মাত্র কয়েক বছর আগেও ভারতের মাটিতে শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হওয়া কঠিন বলে মনে হতো। এ কারণেই তাদের সাম্প্রতিক বৈঠক এতটা মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কিন্তু এই বৈঠক দুই দেশের মধ্যকার বিরোধের পরিধি কিংবা ধরনে কোনো পরিবর্তন আনেনি। আপাতত উভয় পক্ষই নতুন করে সংকট তৈরি হওয়া ঠেকাতে চাইছে, অথচ তাদের মৌলিক মতপার্থক্যগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। এসব বিরোধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সংলাপ হয়তো সম্পর্কের আরও অবনতি ঠেকাতে পারবে, কিন্তু চীন-ভারত সম্পর্ককে নতুন করে ঘনিষ্ঠতার পথে নিয়ে যেতে পারবে না।

তথ্যসূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট।