ভারতের নতুন রাজনীতিতে পুরনো ‘জার্মান ককরোচ’
- আপডেট সময় ০৫:৩৯:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬
- / ১ বার পড়া হয়েছে
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি’ নিয়ে ভাইরাল ভিডিও, পারমাণবিক যুদ্ধেও তেলাপোকার বেঁচে থাকার মিম কিংবা পৃথিবী ধ্বংসের পরও তাদের টিকে থাকার রসিকতা—এসব এখন ভারতীয় ইন্টারনেট সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। তবে হাস্যরসের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক ইতিহাস।
নতুন এক গবেষণা বলছে, ‘জার্মান ককরোচ বা জার্মান তেলাপোকা’ পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত ও আক্রমণাত্মক প্রজাতির তেলাপোকা, যা বাসা-বাড়ি ও শহরাঞ্চলে চরম উপদ্রব সৃষ্টি করে। কিন্তু নামের শুরুতে ‘জার্মান’ থাকলেও আদতে এদের উৎপত্তি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অর্থাৎ ভারত, মায়ানমার ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে। আর্দ্র ও উষ্ণ পরিবেশ এদের প্রিয়।
২০২৪ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ১৭টি দেশ ও ৬টি মহাদেশ থেকে সংগ্রহ করা ২৮১টি তেলাপোকার নমুনার জিন বিশ্লেষণ করেন।
এটিই জার্মান ককরোচ নিয়ে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জিনগত গবেষণা। এক গবেষণায় দেখা যায়, জার্মান ককরোচের বৈজ্ঞানিক নাম Blattella germanica। যা এসেছে Blattella asahinai নামের এশিয়ান ককরোচ থেকে, যা পূর্ব ভারত, মায়ানমার ও বঙ্গোপসাগরের আশপাশে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায়।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ২ হাজার ১০০ বছর আগে ভারত বা মায়ানমারের মানববসতির আশপাশে কিছু এশিয়ান তেলাপোকা মানুষের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে।
সেগুলো বনাঞ্চল ছেড়ে ধীরে ধীরে মানুষের ঘরবাড়ি, খাদ্যভাণ্ডার ও উষ্ণ স্থানে নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। কয়েক প্রজন্মের বিবর্তনের পর তারা এমন এক নগরভিত্তিক প্রজাতিতে পরিণত হয়, যারা আর প্রাকৃতিক পরিবেশে বাঁচতে পারে না। এতেই তাদের বিশ্বজয়ের পথ খুলে যায়।
গবেষণায় তেলাপোকার বিস্তারের দুটি বড় ধাপ শনাক্ত করা হয়েছে। প্রথম ধাপে প্রায় ১ হাজার ২০০ বছর আগে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং ইসলামি সাম্রাজ্যের বিস্তারের মাধ্যমে এরা পশ্চিমা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বড় বিস্তার ঘটে প্রায় ৩৯০ বছর আগে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগে।
গবেষকদের মতে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিসহ বিভিন্ন উপনিবেশিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ অনিচ্ছাকৃতভাবে তেলাপোকার বৈশ্বিক পরিবহনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। খাদ্যপণ্য, কাঠের বাক্স ও জাহাজের ভেতরে লুকিয়ে এরা এশিয়া থেকে আফ্রিকা ও ইউরোপে পৌঁছে যায়।
মজার বিষয় হলো, ইউরোপেই পরে এই তেলাপোকার নাম হয় ‘জার্মান ককরোচ’। প্রায় আড়াইশ বছর আগে মধ্য ইউরোপে এদের উপস্থিতি নথিভুক্ত হওয়ার পর সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াস ১৭৭৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজাতিটির নামকরণ করেন। এরপর থেকেই অনেকের ধারণা ছিল, এর উৎপত্তি জার্মানিতে। কিন্তু নতুন জিনগত গবেষণা বলছে, এই বহুল পরিচিত নগর তেলাপোকার আসল জন্ম দক্ষিণ এশিয়ায়।
গবেষকরা জানিয়েছেন, আধুনিক জার্মান ককরোচের বিস্তার আজও বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক যোগাযোগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কই বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের স্থায়ী উপনিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।
বর্তমানে জার্মান ককরোচ পৃথিবীর সবচেয়ে সহনশীল ও অভিযোজনক্ষম পোকাগুলোর একটি। বাসা-বাড়ি, হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ, মেট্রো স্টেশনসহ প্রায় সব জায়গায় এদের উপস্থিতি দেখা যায়। কীটনাশকের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার কারণে এদের পুরোপুরি নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বঙ্গোপসাগরের আর্দ্র জনপদ থেকে শুরু হওয়া এই ক্ষুদ্র প্রাণীর যাত্রা আজ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় শহরে পৌঁছে গেছে।
প্রসঙ্গত, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এই পোকটির নামের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি হওয়ার ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। তরুণদের হতাশা, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অসন্তোষকে হাস্যরসের ভাষায় তুলে ধরা সিজেপি এখন নরেন্দ্র মোদির সরকার ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য নতুন চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ সাম্প্রতিক দেশটির প্রধান বিচারপতির এক বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে জন্ম নেওয়া এই ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন ইতিমধ্যে ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যায় ক্ষমতাসীন বিজেপিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ফলোয়ার সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যায়। সংখ্যার দিক থেকে বিজেপির অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টকে ছাড়িয়ে যায়। বিজেপির ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন। রাজনৈতিক দল না হলেও জনপ্রিয়তার নিরিখে দেশের বড় দলগুলোকে পেছনে ফেলে দিয়েছে এই ‘পার্টি’। তবে দুই লাখের বেশি অনুসারী থাকা সত্ত্বেও সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্টটি বর্তমানে ভারতে দেখা যাচ্ছে না।
তবে বিতর্কের শুরু হয় গত সপ্তাহে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের একটি মন্তব্যকে ঘিরে। জাল ডিগ্রি ও বেকারত্ব প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি কিছু যুবককে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ বলে উল্লেখ করেন। এর পরপরই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ ও আলোচনা শুরু হয়। অনেক তরুণ ব্যঙ্গাত্মকভাবে নিজেদের ‘তেলাপোকা’ পরিচয়ে একত্রিত হতে থাকেন, আর সেখান থেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে এই অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্মের জন্ম হয়।
সিজেপি কোনো বাস্তব রাজনৈতিক দল নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি অনলাইন আন্দোলন। এর মজার সদস্যপদ শর্তের মধ্যে রয়েছে, বেকার হওয়া, অলস হওয়া, সব সময় অনলাইনে থাকা এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারা।
এই ধারণার উদ্যোক্তা অভিজিৎ দীপক রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ এবং বর্তমানে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, পুরো বিষয়টি প্রথমে শুধুই একটি রসিকতা হিসেবে শুরু হয়েছিল।




















