০২:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
ইটের খাঁজে ইতিহাস ও লোককথা

লক্ষ্মীপুরের প্রাচীন স্থাপনা তিতাখাঁ ও আজিম শাহ জামে মসজিদ

নিজস্ব সংবাদ দাতা
  • আপডেট সময় ১১:২৩:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৪ বার পড়া হয়েছে

লক্ষ্মীপুরের ঐতিহ্য তিতাখাঁ জামে মসজিদ

লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমোহনী থেকে দক্ষিণে চকবাজার সড়কের বাঞ্চানগর এলাকা। সেখানেই পাশাপাশি অবস্থান করছে দুটি প্রাচীন স্থাপনা। একটি ঐতিহাসিক তিতাখাঁ জামে মসজিদ। অন্যটি হজরত আজিম শাহ জামে মসজিদ।

একসময় চারপাশজুড়ে ঘন জঙ্গল ছিল। মানুষের বসতি ছিল খুবই কম। পথঘাটও ছিল দুর্গম। সেই গহিন জঙ্গলের ভেতরে সন্ধান মেলে দুটি প্রাচীন ইবাদতখানার। একটি থেকে আরেকটির দূরত্ব ৫০ মিটারের মতো। সময়ের পরিক্রমায় জঙ্গল কেটে গড়ে উঠেছে জনপদ। বেড়েছে মানুষের বসতি। কিন্তু শত বছরের পুরনো সেই দুই মসজিদ আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমোহনী থেকে দক্ষিণে চকবাজার সড়কের বাঞ্চানগর এলাকা। সেখানেই পাশাপাশি অবস্থান করছে দুটি প্রাচীন স্থাপনা। একটি ঐতিহাসিক তিতাখাঁ জামে মসজিদ। অন্যটি হজরত আজিম শাহ জামে মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে দ্বিতীয়টি মিতাখাঁ মসজিদ বা দায়রা মসজিদ নামেও পরিচিত।

মসজিদ দুটির সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। তবে স্থানীয়দের ধারণা, এগুলো মোগল আমলে তৈরি। প্রায় পাঁচশ বছর আগে এগুলো নির্মিত হয়েছিল। প্রাচীন স্থাপত্যের সঙ্গে মোগলশৈলীর মিল দেখে তারা এমনটি মনে করেন। তবে এ দাবির সত্যতা জানতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।

তিতাখাঁ মসজিদ: জামে মসজিদটি উত্তর তেমোহনীর দায়রা বাড়ির পাশে অবস্থিত। এটি ইসলাম বক্স ভূঁঞা বাড়ির সামনে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় পুরো এলাকাটি ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। সেই জঙ্গলের মধ্যেই ১২২৯ হিজরিতে প্রাচীন মসজিদটির সন্ধান পাওয়া যায়।

হজরত আজিম শাহ (র.) বাগানের মধ্যে মসজিদটি খুঁজে পান। তবে মসজিদটির নাম ‘তিতাখাঁ’ কীভাবে হলো, তা নিশ্চিত নয়। কারো মতে, তিতাখাঁ নামের এক ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেন। স্থানীয়ভাবে বলা হয়, ওমর আলী নামে এক কারিগর এর কারুকাজ করেছিলেন।

১২২৯ হিজরিতে আবিষ্কৃত লক্ষ্মীপুরের ঐতিহাসিক তিতাখাঁ জামে মসজিদ। তিনটি গম্বুজ, চার মিনার ও দেয়ালের দৃষ্টিনন্দন সিরামিকের শৈল্পিক নকশা নিয়ে আজও টিকে রয়েছে মুসলিমদের এ ইবাদতখানা | ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

মসজিদটির চার কোনায় চারটি ছোট মিনার আছে। ওপরের অংশে রয়েছে তিনটি বড় গম্বুজ। প্রায় ৪৯ ফুট লম্বা ও ৪২ ফুট প্রস্থের এ মসজিদ একতলা। এটি ইট, চুন ও সুরকি দিয়ে নির্মিত। এর দেয়ালের কারুকাজ বেশ আকর্ষণীয়। লতাপাতা ও শৈল্পিক নকশার পাশাপাশি ভাঙা সিরামিকের টুকরো ব্যবহার করা হয়েছে। ছাদটি নির্মিত হয়েছিল প্রাচীন পদ্ধতিতে। কাঠের কাঠামোর ওপর ইট বসিয়ে চুন-সুরকির প্রলেপ দেয়া হয়।

সময়ের সঙ্গে মসজিদে সংস্কারকাজ হয়েছে। ফলে কিছু পুরনো নকশায় পরিবর্তন এসেছে। তবে মূল মসজিদটি এখনো ঐতিহ্য বহন করছে। এখানে একসঙ্গে পাঁচ শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করছেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে জানান, প্রায় ৫০০ বছর আগে এলাকাটি নদী ও জঙ্গলবেষ্টিত ছিল। পাঠান পরিবারের তিতাখাঁ নামের এক সম্পদশালী ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেছিলেন। তখন নির্মাণসামগ্রী পাকিস্তান থেকে আনা হয়েছিল।

সব ধর্মের মানুষই একসময় এ মসজিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেন। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মসজিদটি পরিচালিত হচ্ছে।

আজিম শাহ (র.)-এর পুরনো মসজিদের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে চারতলা আধুনিক ভবন ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

আজিম শাহ (র.) জামে মসজিদ: তিতাখাঁ মসজিদ থেকে মাত্র ৫০ মিটার উত্তরে হজরত আজিম শাহ জামে মসজিদ। এ মসজিদকে ঘিরে স্থানীয় শ্রুতিকথা রয়েছে। প্রচলিত আছে, ১৭৮৫ সালে পীর দায়েম শাহের নির্দেশে ইয়েমেন থেকে লক্ষ্মীপুরে আসেন আজিম শাহ (র.)। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। লক্ষ্মীপুরে এসে তিনি ঘন জঙ্গলে প্রবেশ করেন। অনেক সময় পার হলেও তিনি বের হননি। জঙ্গলে বাঘসহ বিভিন্ন হিংস্র প্রাণী ছিল। তাই স্থানীয়রা চিন্তিত হয়ে পড়েন। তারা লগি-বল্লম নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা একটি পুরনো ইবাদতখানার সন্ধান পান। তারা দেখেন, আজিম শাহ ইবাদতে মগ্ন। আর মসজিদের সামনে একটি বাঘ শান্তভাবে বসে আছে। লোকমুখে প্রচলিত গল্পে বলা হয়, তিনি যখন কোরআন তিলাওয়াত করতেন, বনের হিংস্র প্রাণীরা তা শান্ত হয়ে শুনত।

আজিম শাহ (র.)-এর ষষ্ঠ বংশধর ও মসজিদের সহসভাপতি হাফেজ ময়ইদুল হক ভিন্ন তথ্য দেন। তার মতে, আজিম শাহ (র.) পীর দায়েম শাহের নির্দেশে দুটি বাঘের পিঠে চড়ে লক্ষ্মীপুরে আসেন। তিনি আরো জানান, আজিম শাহের আসার আগে এলাকাটি নদীবেষ্টিত ছিল। তৎকালীন এক আল্লাহর অলি পুস্তো ভাষায় চিঠি লিখে দোয়া করেছিলেন। ফলে নদীটি দূরে সরে যায় ও এলাকাটি জঙ্গলে রূপ নেয়। ওই অলিই প্রথম মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন।

জঙ্গলের ভেতরে যখন মসজিদটি পাওয়া যায়, তখন সেখানে মাত্র আটজনের নামাজের জায়গা ছিল। ১৮০০ শতকের শুরুর দিকে সংস্কার করে ২৪ জনের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে পুরনো মসজিদের পাশে চারতলা আধুনিক মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে একসঙ্গে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন।

ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

ইটের খাঁজে ইতিহাস ও লোককথা

লক্ষ্মীপুরের প্রাচীন স্থাপনা তিতাখাঁ ও আজিম শাহ জামে মসজিদ

আপডেট সময় ১১:২৩:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমোহনী থেকে দক্ষিণে চকবাজার সড়কের বাঞ্চানগর এলাকা। সেখানেই পাশাপাশি অবস্থান করছে দুটি প্রাচীন স্থাপনা। একটি ঐতিহাসিক তিতাখাঁ জামে মসজিদ। অন্যটি হজরত আজিম শাহ জামে মসজিদ।

একসময় চারপাশজুড়ে ঘন জঙ্গল ছিল। মানুষের বসতি ছিল খুবই কম। পথঘাটও ছিল দুর্গম। সেই গহিন জঙ্গলের ভেতরে সন্ধান মেলে দুটি প্রাচীন ইবাদতখানার। একটি থেকে আরেকটির দূরত্ব ৫০ মিটারের মতো। সময়ের পরিক্রমায় জঙ্গল কেটে গড়ে উঠেছে জনপদ। বেড়েছে মানুষের বসতি। কিন্তু শত বছরের পুরনো সেই দুই মসজিদ আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমোহনী থেকে দক্ষিণে চকবাজার সড়কের বাঞ্চানগর এলাকা। সেখানেই পাশাপাশি অবস্থান করছে দুটি প্রাচীন স্থাপনা। একটি ঐতিহাসিক তিতাখাঁ জামে মসজিদ। অন্যটি হজরত আজিম শাহ জামে মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে দ্বিতীয়টি মিতাখাঁ মসজিদ বা দায়রা মসজিদ নামেও পরিচিত।

মসজিদ দুটির সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। তবে স্থানীয়দের ধারণা, এগুলো মোগল আমলে তৈরি। প্রায় পাঁচশ বছর আগে এগুলো নির্মিত হয়েছিল। প্রাচীন স্থাপত্যের সঙ্গে মোগলশৈলীর মিল দেখে তারা এমনটি মনে করেন। তবে এ দাবির সত্যতা জানতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।

তিতাখাঁ মসজিদ: জামে মসজিদটি উত্তর তেমোহনীর দায়রা বাড়ির পাশে অবস্থিত। এটি ইসলাম বক্স ভূঁঞা বাড়ির সামনে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় পুরো এলাকাটি ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। সেই জঙ্গলের মধ্যেই ১২২৯ হিজরিতে প্রাচীন মসজিদটির সন্ধান পাওয়া যায়।

হজরত আজিম শাহ (র.) বাগানের মধ্যে মসজিদটি খুঁজে পান। তবে মসজিদটির নাম ‘তিতাখাঁ’ কীভাবে হলো, তা নিশ্চিত নয়। কারো মতে, তিতাখাঁ নামের এক ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেন। স্থানীয়ভাবে বলা হয়, ওমর আলী নামে এক কারিগর এর কারুকাজ করেছিলেন।

১২২৯ হিজরিতে আবিষ্কৃত লক্ষ্মীপুরের ঐতিহাসিক তিতাখাঁ জামে মসজিদ। তিনটি গম্বুজ, চার মিনার ও দেয়ালের দৃষ্টিনন্দন সিরামিকের শৈল্পিক নকশা নিয়ে আজও টিকে রয়েছে মুসলিমদের এ ইবাদতখানা | ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

মসজিদটির চার কোনায় চারটি ছোট মিনার আছে। ওপরের অংশে রয়েছে তিনটি বড় গম্বুজ। প্রায় ৪৯ ফুট লম্বা ও ৪২ ফুট প্রস্থের এ মসজিদ একতলা। এটি ইট, চুন ও সুরকি দিয়ে নির্মিত। এর দেয়ালের কারুকাজ বেশ আকর্ষণীয়। লতাপাতা ও শৈল্পিক নকশার পাশাপাশি ভাঙা সিরামিকের টুকরো ব্যবহার করা হয়েছে। ছাদটি নির্মিত হয়েছিল প্রাচীন পদ্ধতিতে। কাঠের কাঠামোর ওপর ইট বসিয়ে চুন-সুরকির প্রলেপ দেয়া হয়।

সময়ের সঙ্গে মসজিদে সংস্কারকাজ হয়েছে। ফলে কিছু পুরনো নকশায় পরিবর্তন এসেছে। তবে মূল মসজিদটি এখনো ঐতিহ্য বহন করছে। এখানে একসঙ্গে পাঁচ শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করছেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে জানান, প্রায় ৫০০ বছর আগে এলাকাটি নদী ও জঙ্গলবেষ্টিত ছিল। পাঠান পরিবারের তিতাখাঁ নামের এক সম্পদশালী ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেছিলেন। তখন নির্মাণসামগ্রী পাকিস্তান থেকে আনা হয়েছিল।

সব ধর্মের মানুষই একসময় এ মসজিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেন। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মসজিদটি পরিচালিত হচ্ছে।

আজিম শাহ (র.)-এর পুরনো মসজিদের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে চারতলা আধুনিক ভবন ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

আজিম শাহ (র.) জামে মসজিদ: তিতাখাঁ মসজিদ থেকে মাত্র ৫০ মিটার উত্তরে হজরত আজিম শাহ জামে মসজিদ। এ মসজিদকে ঘিরে স্থানীয় শ্রুতিকথা রয়েছে। প্রচলিত আছে, ১৭৮৫ সালে পীর দায়েম শাহের নির্দেশে ইয়েমেন থেকে লক্ষ্মীপুরে আসেন আজিম শাহ (র.)। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। লক্ষ্মীপুরে এসে তিনি ঘন জঙ্গলে প্রবেশ করেন। অনেক সময় পার হলেও তিনি বের হননি। জঙ্গলে বাঘসহ বিভিন্ন হিংস্র প্রাণী ছিল। তাই স্থানীয়রা চিন্তিত হয়ে পড়েন। তারা লগি-বল্লম নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা একটি পুরনো ইবাদতখানার সন্ধান পান। তারা দেখেন, আজিম শাহ ইবাদতে মগ্ন। আর মসজিদের সামনে একটি বাঘ শান্তভাবে বসে আছে। লোকমুখে প্রচলিত গল্পে বলা হয়, তিনি যখন কোরআন তিলাওয়াত করতেন, বনের হিংস্র প্রাণীরা তা শান্ত হয়ে শুনত।

আজিম শাহ (র.)-এর ষষ্ঠ বংশধর ও মসজিদের সহসভাপতি হাফেজ ময়ইদুল হক ভিন্ন তথ্য দেন। তার মতে, আজিম শাহ (র.) পীর দায়েম শাহের নির্দেশে দুটি বাঘের পিঠে চড়ে লক্ষ্মীপুরে আসেন। তিনি আরো জানান, আজিম শাহের আসার আগে এলাকাটি নদীবেষ্টিত ছিল। তৎকালীন এক আল্লাহর অলি পুস্তো ভাষায় চিঠি লিখে দোয়া করেছিলেন। ফলে নদীটি দূরে সরে যায় ও এলাকাটি জঙ্গলে রূপ নেয়। ওই অলিই প্রথম মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন।

জঙ্গলের ভেতরে যখন মসজিদটি পাওয়া যায়, তখন সেখানে মাত্র আটজনের নামাজের জায়গা ছিল। ১৮০০ শতকের শুরুর দিকে সংস্কার করে ২৪ জনের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে পুরনো মসজিদের পাশে চারতলা আধুনিক মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে একসঙ্গে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন।