আগুন কেড়ে নিল ঈদের হাসি, কালশীতে কান্না আর দীর্ঘশ্বাস
- আপডেট সময় ১১:১৩:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
- / ৫ বার পড়া হয়েছে
মাগরিবের আজান শেষে দোকানে তালা দিয়ে বাসায় ফিরেছিলেন আমেনা বেগম। তখনও বুঝতে পারেননি, কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে তার জীবনের একমাত্র সম্বল।
ছোট ছেলের ফোনকল পেয়ে ছুটে আসেন কালশী বস্তিতে। এসে দেখেন, আগুনের লেলিহান শিখা গিলে নিয়েছে তার ভাঙারির দোকান।
চারদিকে শুধু ধোঁয়া, আর মানুষের আহাজারি। সোমবার (২৫ মে) রাতের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে রাজধানীর পল্লবীর কালশী বস্তি যেন পরিণত হয় এক ধ্বংসস্তূপে।
আগুনে পুড়ে গেছে শত শত ঘর, দোকান ও মানুষের বহু বছরের জমানো স্বপ্ন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমেনা বেগম বলেন, মাগরিবের আজানের পরে বাসায় গিয়েছিলাম।
ছোট ছেলে ফোন করে বলে দোকানে আগুন লাগছে। আইতে আইতে দেখি সব শেষ। কিছুই বাইর করতে পারি নাই। একই চিত্র প্লাস্টিক ব্যবসায়ী রহমানের জীবনেও। আগুনে তার দোকানের প্রায় ৫০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের সর্বস্ব পুড়ে যেতে দেখেছেন তিনি।
রহমান বাংলাানিউজকে বলেন, আমার প্লাস্টিকের দোকান। দোকানে ৫০ লাখ টাকার বেশি মালামাল ছিল। নামাজ পড়তে গিয়ে এসে দেখি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমার আর কিছুই রইল না। পথে বসে গেলাম।
তার অভিযোগ, এর আগেও এলাকায় আগুন লাগানোর চেষ্টা হয়েছিল। গত রোববারও এখানে আগুন লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তখন আগুন নিভে যায়। এবার আর কিছুই বাঁচানো গেল না।
অগ্নিকাণ্ডস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কেউ ছাইয়ের স্তূপে পোড়া জিনিস খুঁজছেন, কেউ বসে আছেন নির্বাক হয়ে। আবার কেউ বুক চাপড়ে কাঁদছেন।
মুদি দোকানি কুলসুমের কণ্ঠেও ছিল অসহায়ত্বের দীর্ঘশ্বাস। তিনি বলেন, আমি আমার শাশুড়িকে নিয়ে এই দোকান দিয়ে চলতাম। ঈদ উপলক্ষে দোকানে মাল তুলেছিলাম। সব পুড়ে গেছে। আমার আর পরনের কাপড় ছাড়া কিছুই রইল না।
প্রত্যক্ষদর্শী সুমন বলেন, সন্ধ্যা সাতটার দিকে আগুন লাগে। প্রথমে বাঁশে আগুন ধরতে দেখেন তিনি। পরে পাশের প্লাস্টিক ও ভাঙারির দোকানে আগুন ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, আমি কালশী বাসস্ট্যান্ডে ছিলাম। একের পর এক ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার জানান, সন্ধ্যা ৭টা ৩২ মিনিটে প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে আগুনের ভয়াবহতা দেখে আরও ইউনিট যোগ দেয়।
তিনি বলেন, এখানে প্রায় ১২শ ঘর ও ভাঙারির দোকান রয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের বসতি। মোট ১৫টি ইউনিটের ১২৩ জন ফায়ার ফাইটার স্থানীয় জনগণ, ভলান্টিয়ার, পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।
আগুন নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয়েছে বলেও জানান তিনি। সরু রাস্তা, পানির উৎসের সংকট এবং ভাঙারি, প্লাস্টিক ও কাগজের মতো দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুনের সূত্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
এর আগে সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ২৩ মিনিটে কালশী বস্তিতে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। রাত ৭টা ৩২ মিনিটে প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট। রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ঈদের ঠিক আগে কালশীর এই আগুন কেড়ে নিয়েছে শত শত পরিবারের শেষ সম্বল। পোড়া ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে এখন তাদের একটাই প্রশ্ন, নতুন করে কীভাবে শুরু হবে জীবন?




















