নিজের দলই যেন তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে…
- আপডেট সময় ০৫:৪৭:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
- / ৭ বার পড়া হয়েছে
বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর পুরোপুরি বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসিকে। নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে জড়ো হওয়া আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা যখন তার নাম ধরে গান গাইছিলেন, মেসি তখন গভীর দৃষ্টিতে দীর্ঘক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
হয়তো তখন তার মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপে এমন ভালোবাসা পাওয়ার এটাই শেষ মুহূর্ত। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও, যিনি মেসির মতোই টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন, টুর্নামেন্টে কিংবদন্তি এই ফরোয়ার্ডের এটাই শেষ ম্যাচ কি না- সেই প্রশ্নে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
একই সঙ্গে ডিসেম্বর মাসে শেষ হতে যাওয়া নিজের চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবছিলেন তিনি। স্কালোনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি মেসির সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।
এরপর তিনি নিজেই কাঁদতে শুরু করেন এবং সংবাদ সম্মেলন ছেড়ে চলে যান। সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটবলারদের পারফরম্যান্স কমে যায়।
কিন্তু সেরা খেলোয়াড়রা নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন। মেসি অবশ্য শুধু মানিয়েই নেননি, খেলাটিকে নিজের নিয়ন্ত্রণেও রেখেছেন। ফলে বয়স বা গতির ঘাটতি তার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনায় অভিষেকের পর থেকে মেসি অন্তত পাঁচবার নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। আজকের আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মায়ামির মেসি সেই দীর্ঘ পরিবর্তনেরই ফল।
৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ খেলতে নেমেও তিনি পায়ের জাদুতে মুগ্ধ করেছেন বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের। কিন্তু গত রাতের ফাইনালের পর মনে হচ্ছে, মেসির অবিস্মরণীয় বিশ্বকাপ অধ্যায়ের হয়তো সমাপ্তি ঘটতে চলেছে। তবে শেষ ম্যাচে যেন মনে হলো, নিজের দলই তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক মনোভাবের মাশুল গুনতে হয়েছে মেসি ও তার দলকে। ফলে শিরোপা ছাড়াই বিশ্বমঞ্চে নিজের সম্ভাব্য শেষ ম্যাচ খেলতে হয়েছে আর্জেন্টাইন এই মহানায়ককে।
শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক ও মারমুখী কৌশল মেসির খেলায় কোনো সাহায্য তো করেইনি, বরং উল্টো দলের প্রধান অনুপ্রেরণা ও অধিনায়ককে ম্যাচের বেশির ভাগ সময় কার্যত নিষ্ক্রিয় দর্শক বানিয়ে রেখেছিল।
স্পেনের এই জয় ছিল মূলত ফুটবলেরই জয়। কারণ পুরো ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনার মনোযোগ ফুটবলের চেয়ে অন্য বিষয়েই বেশি ছিল বলে মনে হয়েছে। ম্যাচের শুরুতে স্লোভেনিয়ান রেফারি স্লাভকো ভিনসিক এমন শিথিলতা দেখান, যা পুরো বিশ্বকাপজুড়েই প্রতিপক্ষ দলগুলোর ক্ষোভের কারণ ছিল।
দানি ওলমোর ওপর আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি কঠিন ফাউলের পরও তাকে শুধু সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে স্পেনের সমর্থকেরা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নাম ধরে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান দিতে শুরু করেন।
এটি ছিল মূলত সেই সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রতি ইঙ্গিত, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে টুর্নামেন্টের কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্বের কারণেই আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার পথ সহজ হয়েছে।
আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেস মিকেল ওয়ারজাবালকে ফাউল করার জন্য ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন ৪০তম মিনিটে। এত দেরিতে প্রথম হলুদ কার্ড দেখানো স্টেডিয়ামে উপস্থিত অনেকের কাছেই ছিল বিস্ময়কর।
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে যে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিল আর্জেন্টিনা, ফাইনালে সেই দলকে এমন কৌশল নিয়ে খেলতে দেখা ছিল হতাশাজনক। এতে মেসির প্রতিভা ও প্রভাব দেখানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
মেসিও এক পর্যায়ে এই উত্তেজনার অংশ হয়ে যান। স্পেনের মার্ক কুকুরেয়াকে বহিষ্কার করার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি রেফারির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। কারণ কুকুরেয়া মুখের সামনে হাত রেখে কথা বলছিলেন। এই বিশ্বকাপে এমন আচরণ আক্রমণাত্মকভাবে করলে লাল কার্ড পাওয়ার বিধান রয়েছে।
এর ঠিক আগে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্সের সবচেয়ে হতাশাজনক মুহূর্তটি আসে। অতিরিক্ত সময়ে যাওয়ার ঠিক আগে এনজো ফার্নান্দেজ কোনো কারণ ছাড়াই কুবারসির ওপর চড়াও হন।
চেলসির এই মিডফিল্ডার প্রতিপক্ষকে মাটিতে ফেলে দেন, অথচ তখন তার চোখ বলের দিকেও ছিল না। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পাওয়াটা তাই পুরোপুরি যৌক্তিক ছিল। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনা একটি শটও নিতে পারেনি। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে নির্ধারিত সময়ে কোনো শট নিতে না পারা প্রথম দল তারা।
আর ম্যাচের ১১৭তম মিনিটে যখন অবশেষে শট নেওয়ার সুযোগ আসে, তখন মেসির নেওয়া শটটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। স্পেনের অন-টার্গেট শট ছিল ১২টি, আর আর্জেন্টিনার ছিল একটিও নয়।
হতাশাজনক প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে যতটি পাস দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি ফাউল করেছে। সেখানে পাস ছিল আটটি, আর ফাউল ছিল নয়টি। এটাই ফাইনালে তাদের খেলার ধরনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা মেসির সঙ্গে কাঁদছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দুই দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের মধ্যে অশোভন হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামা লেয়ান্দ্রো পারেদেস নিজের স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক আচরণ দেখান। তিনি এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরেন। পরে স্পেনের গাভিকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাতেও তিনি জড়িয়ে পড়েন। এত অসাধারণ একটি বিশ্বকাপের সমাপ্তি এমন অপ্রীতিকর ঘটনায় হওয়া দুঃখজনক।
বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিল বিশ্বমঞ্চে মেসির ৩৪তম ম্যাচ। এখন ধারণা করা হচ্ছে, তিনি হয়তো পরের বিশ্বকাপে আর খেলবেন না। তবে একটি বিষয় মানতেই হবে- এই আর্জেন্টাইন জাদুকর ফুটবল মাঠে পা রাখা সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন।




















