৩১ বছরেও বাসযোগ্য হয়নি পূর্বাচল প্রকল্প
- আপডেট সময় ০৫:৪৪:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
- / ০ বার পড়া হয়েছে
পূর্বাচল উপশহরের কালীগঞ্জ অংশের ১৫ নম্বর সেক্টরের বাসাবাসি এলাকার প্লটগুলো দীর্ঘদিন কার্যত পরিত্যক্ত পড়ে আছে ।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ‘পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প’ স্থবির হয়ে আছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সমন্বয়হীনতায় দীর্ঘ ৩১ বছরেও বাসযোগ্য হয়নি প্রকল্পটি। পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার তীব্র সংকট রয়েছে। নিরাপত্তাহীনতা ও জনশূন্যতার কারণে অপরাধের ঝুঁকিও কয়েকগুণ।
ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে রাজউক ১৯৯৫ সালে প্রকল্পটি হাতে নেয়। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই আবাসন প্রকল্প নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৬,২২৭ একর জমির ওপর বিস্তৃত। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় ৩১ বছরেও এই মেগা প্রজেক্ট আজও পুরোপুরি বসবাসের উপযোগী হয়ে ওঠেনি।
কাগজে-কলমে প্রকল্পের সিংহভাগ কাজ শেষ হওয়ার দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। খোদ প্লট মালিক ও আবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহুমুখী প্রশাসনিক জটিলতা, মৌলিক নাগরিক সেবার অভাব এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তই এই দীর্ঘসূত্রতার মূল কারণ।
রাজউকের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে পূর্বাচল প্রকল্পের কাজ ধীরগতির হয়েছে। প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়েও শেষ হয়নি। বারবার এর মেয়াদ ও খরচ বাড়ানো হয়েছে। ফলে প্রাথমিক খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যার বাড়তি আর্থিক চাপ শেষ পর্যন্ত প্লট গ্রহীতাদের ওপর পড়েছে। এছাড়া গত তিন দশকে বারবার প্রকল্প পরিচালক বদল হওয়ায় কাজের কোনো ধারাবাহিকতা বা নীতিগত স্থায়িত্ব ছিল না।
পূর্বাচলের ১৭ নম্বর সেক্টরের স্থানীয় অধিবাসী নাঈম আহমেদ বলেন, ‘একটি এলাকায় বসবাস করতে হলে নিরাপত্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, শপিং কমপ্লেক্স এবং প্রয়োজনীয় সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। কিন্তু এখানে এসবের কিছুই এখনো গড়ে ওঠেনি। নিরাপত্তার অভাবে অনেক প্লট গ্রহীতাই ভবন করতে ভয় পাচ্ছেন।’
২৮ নম্বর সেক্টরে গড়ে ওঠা একমাত্র ভবনের বাসিন্দা সজিব মৃধা জানান, ‘পূর্বাচলে মৌলিক নাগরিক সুবিধার বড় ঘাটতি রয়েছে। হাজার হাজার প্লট বরাদ্দ ও কিছু ভবন তৈরি হলেও বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করার সাহস পাচ্ছেন না। তাছাড়া স্কুল, হাসপাতাল ও বাজারের অভাবের কারণে দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
জনশূন্যতা ও নিরাপত্তার শঙ্কা
জানা গেছে, শুরু থেকেই ভূমি অধিগ্রহণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বিরোধ প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ভূমি মালিক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং তাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি আইনি মারপ্যাঁচে আটকে ছিল। জমির সঠিক ডিমার্কেশন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং মূল লে-আউট নকশার বৈধতা নিয়ে বহুবার আইনি লড়াই হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের উন্নয়ন কাজে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
পূর্বাচলের লে-আউট বা মহাপরিকল্পনা দফায় দফায় পরিবর্তন করা হয়েছে, যা অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের পরিচায়ক। কখনো স্টেডিয়ামের স্থান পরিবর্তন, আবার কখনো বাণিজ্যিক জোনের লে-আউট বদলানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্মিত রাস্তা বা ড্রেন ভেঙে আবার নতুন করে বড় পরিসরে (যেমন ৪ লেন থেকে সড়ক প্রশস্তকরণ বা আন্ডারগ্রাউন্ড ইউটিলিটি লাইনের জন্য রাস্তা কাটা) কাজ করতে হয়েছে, যা সরকারি অর্থের বড় অপচয় ঘটিয়েছে।
স্থানীয় একজন অধিবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পূর্বাচলের অনেক সেক্টরে স্থায়ী বসতি না থাকায় এবং ফাঁকা প্লট পড়ে থাকায় সন্ধ্যার পর এলাকা সুনসান হয়ে পড়ে। চুরি, ছিনতাই এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এখন নিত্য ঘটনা। নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার এই দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্লট মালিক সেখানে ভবন নির্মাণে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন।
সরকারের নতুন উদ্যোগ
সাম্প্রতিক সময়ে ৩০০ ফিট প্রশস্ত এক্সপ্রেসওয়ে যাতায়াত ব্যবস্থাকে সহজ করেছে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম জোরদার করতে এলাকাটিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) অন্তর্ভুক্তিসহ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও ঢাকা ওয়াসায় অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছ। একই সঙ্গে রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জ উপজেলার প্রকল্পের অংশ ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
গত ১ জুলাই পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে নবনির্মিত ‘বরকাউ পুলিশ ক্যাম্প’ উদ্বোধন করা হয়। এ সময় আইজিপি বলেন, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকায় ডিএমপির চারটি থানা, ছয়টি তদন্ত কেন্দ্র এবং দুটি পুলিশ লাইনস স্থাপনে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া তিনটি ডিসি অফিস স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের বিভিন্ন সেক্টরে ৪১টি পুলিশ বক্স স্থাপনের প্রক্রিয়াও চলছে।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান আশার কথা শুনিয়ে বলেন, ‘নগরবাসীর জীবনমান উন্নত ও স্বস্তিদায়ক করতে ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো জরুরি নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। খুব শিগগির স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে পূর্বাচলে সরেজমিনে পরিদর্শন করে সব সমস্যা চিহ্নিত এবং দ্রুত সমাধান করা হবে। পাশাপাশি, নাগরিকদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে ডিএনসিসির জোনাল অফিস স্থাপনের কাজও বর্তমানে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্বাচলকে সত্যিকারের আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করতে হলে দ্রুত পানি, বিদ্যুৎ এবং আধুনিক স্যুয়ারেজ সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে তিন দশকের এই মেগা প্রজেক্ট কেবল ইট-পাথর ও ফাঁকা প্লটের কংক্রিট জঙ্গল হিসেবেই পড়ে থাকবে।
এ বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া বার্তা দেওয়া হলেও তার সাড়া মেলেনি।


















