০৫:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
ইউনিয়ন পরিষদকেন্দ্রিক মফস্বলের ব্যবসা-বাণিজ্য

সম্ভাবনার দুয়ার খুলুক গ্রামীণ অর্থনীতিতে

নিজস্ব সংবাদ দাতা
  • আপডেট সময় ০৫:০৩:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
  • / ১ বার পড়া হয়েছে

মো. বোরহান উদ্দিন- উদ্যোক্তা, সমাজ-গণমাধ্যম কর্মী ও কলাম লেখক

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি শুধু বড় বড় শহর, শিল্পাঞ্চল কিংবা রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম, হাটবাজার ও ইউনিয়ন পরিষদকেন্দ্রিক জনপদেও গড়ে উঠেছে অর্থনীতির এক বিশাল সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। অথচ এই সম্ভাবনার অনেকটাই এখনো রয়ে গেছে অব্যবহৃত। পরিকল্পিত উদ্যোগ, সরকারি সহযোগিতা এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে ইউনিয়ন পরিষদকেন্দ্রিক মফস্বল এলাকাগুলো হয়ে উঠতে পারে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি।

গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তি হাটবাজার
একটি ইউনিয়ন পরিষদকে কেন্দ্র করে সাধারণত গড়ে ওঠে ছোট-বড় বাজার, সাপ্তাহিক হাট, মুদি দোকান, কৃষিপণ্যের আড়ত, মাছ-মাংসের ব্যবসা, কাপড়ের দোকান, ফার্মেসি, কৃষি উপকরণের দোকানসহ নানা ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকেন হাজারো মানুষ।

কৃষক তাঁর উৎপাদিত ধান, সবজি, ফলমূল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে বিক্রি করেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সেই পণ্য সংগ্রহ করে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেন। পরিবহন শ্রমিক, দোকান কর্মচারী, দিনমজুর, আড়তদার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ। অর্থাৎ একটি ইউনিয়ন বাজার সচল থাকলে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসে।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা
মফস্বল এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তুলনামূলক কম পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ। একজন তরুণ চাইলে অনলাইনভিত্তিক পণ্য বিক্রি, কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ, দুগ্ধ খামার, পোলট্রি, মৎস্য চাষ, কৃষি যন্ত্রপাতি ভাড়া কিংবা ক্ষুদ্র উৎপাদনমুখী শিল্প গড়ে তুলতে পারেন।

বিশেষ করে বর্তমান ডিজিটাল যুগে গ্রামে বসেও শহর ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। প্রয়োজন শুধু প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজারসংযোগ।

উন্নয়নের পথে যেসব বাধা
সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ইউনিয়ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। অনেক বাজারে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। উন্নত সড়ক যোগাযোগ, পণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা, গুদাম, আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ পরিবেশের অভাব রয়েছে।

এ ছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সহজে ব্যাংকঋণ পান না। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনার আধুনিক কৌশল সম্পর্কে জানেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার সমস্যাও গ্রামীণ অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করে।

ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ
ইউনিয়ন পরিষদ শুধু নাগরিক সনদ, জন্মনিবন্ধন কিংবা স্থানীয় প্রশাসনিক সেবার কেন্দ্র নয়; এটি স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হতে পারে।

প্রতিটি ইউনিয়নের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা চিহ্নিত করে একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। স্থানীয় হাটবাজারের অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবসায়ীদের নিবন্ধন ও তথ্যভান্ডার তৈরি, তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, কৃষিপণ্য বিপণনে সহযোগিতা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।

পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে নারীদের কর্মসংস্থান ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে।

মফস্বলেই তৈরি হোক কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র
প্রতিবছর অসংখ্য তরুণ কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন। অথচ তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে শহরের ওপর চাপ কমবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।

স্থানীয়ভাবে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য উৎপাদন, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র কারখানা, অনলাইন ব্যবসা এবং পরিবহনসেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। এজন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনিয়ন পরিষদ ভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা ও অসুবিধা: বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইউনিয়ন পরিষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। ইউনিয়ন পরিষদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ এবং সেবা খাত গড়ে উঠতে পারে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয় এবং মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

ইউনিয়ন পরিষদ ভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা

ক) স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি: ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠলে এলাকার বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

খ) স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন: ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের ফলে এলাকার মানুষের আয় বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।

গ)  সহজে ব্যবসা পরিচালনা: স্থানীয় পর্যায়ে ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকে।

ঘ) কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ: কৃষকরা উৎপাদিত ফসল, মাছ, দুধ, শাকসবজি ও অন্যান্য পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে পারেন।

ঙ) যোগাযোগ ও পরিবহন সুবিধা: ইউনিয়ন পর্যায়ে বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে স্থানীয় যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে।

চ) নারী উদ্যোক্তা তৈরি: নারীরা হাঁস-মুরগি পালন, হস্তশিল্প, সেলাই, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারেন।

ছ) স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার: এলাকার জমি, শ্রম, কাঁচামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে নতুন ব্যবসা গড়ে তোলা যায়।

জ) দারিদ্র্য বিমোচন: ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পায়।

ঝ) স্থানীয় বাজারের সম্প্রসারণ: নতুন দোকান, হাট-বাজার, কৃষিপণ্য সংগ্রহ কেন্দ্র ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

ঞ) সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমে সহায়তা: ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবসায়িক অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়।

ইউনিয়ন পরিষদ ভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের অসুবিধা

ক) অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা: অনেক এলাকায় ভালো রাস্তা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও ইন্টারনেটের অভাব রয়েছে।

খ) মূলধনের অভাব: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সহজে ব্যাংকঋণ বা পর্যাপ্ত বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে পারেন না।

গ) প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব: অনেক ব্যবসায়ী আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল মার্কেটিং ও অনলাইন ব্যবসা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না।

ঘ) বাজারের সীমাবদ্ধতা: গ্রামীণ এলাকায় ক্রেতার সংখ্যা ও ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় ব্যবসার প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়।

ঙ) দক্ষ জনবলের অভাব: প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ কর্মীর অভাবে ব্যবসার উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে।

চ) প্রশাসনিক জটিলতা: বিভিন্ন সরকারি অনুমোদন, লাইসেন্স ও কাগজপত্র সংগ্রহে সময় ও অর্থ ব্যয় হতে পারে।

ছ) পণ্য সংরক্ষণের সমস্যা: হিমাগার, গুদাম ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

জ) পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি: প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ হয়।

ঝ)প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি: বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও অতিবৃষ্টির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ঞ) বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা: গ্রামীণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বড় কোম্পানি ও শহরকেন্দ্রিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।

ইউনিয়ন পরিষদভিত্তিক সম্ভাবনাময় ব্যবসার ক্ষেত্র

কৃষিভিত্তিক ব্যবসাধান, সবজি, ফল ও কৃষিপণ্য
কৃষিভিত্তিক ব্যবসা: ধান, সবজি, ফল ও কৃষিপণ্য

পোলট্রি ও মৎস্য: মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি পালন

কুটির শিল্প: হস্তশিল্প, সেলাই ও তাঁতশিল্প

স্থানীয় বাজার: মুদি দোকান, ফার্মেসি ও কৃষি উপকরণ

ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে করণীয়

ক) ইউনিয়ন পর্যায়ে আধুনিক হাট-বাজার ও ব্যবসায়িক অবকাঠামো গড়ে তোলা।

খ) ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা।

গ) নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

ঘ) ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রশাসনিক সেবা সহজ করা।

ঙ) কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার ও গুদাম নির্মাণ করা।

চ) ডিজিটাল মার্কেটিং ও ই-কমার্স সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া।

ছ) সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।

ইউনিয়ন পরিষদভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। তবে মূলধনের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও বাজারজাতকরণের সমস্যার কারণে এ খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তাই ইউনিয়ন পরিষদ, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিটি ইউনিয়ন একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু রাজধানী কিংবা জেলা শহরের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। উন্নয়নের আলো পৌঁছে দিতে হবে প্রতিটি ইউনিয়ন, প্রতিটি গ্রাম এবং প্রতিটি হাটবাজারে।

ইউনিয়ন পরিষদকে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করতে হবে এবং গ্রামীণ বাজারব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, একটি ইউনিয়নের বাজার যত সমৃদ্ধ হবে, সেই ইউনিয়নের মানুষের জীবনযাত্রার মান তত উন্নত হবে। আর হাজার হাজার ইউনিয়নের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই একদিন গড়ে তুলবে একটি শক্তিশালী, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

গ্রামের অর্থনীতি বাঁচলে দেশের অর্থনীতি এগোবে—আর সেই অর্থনৈতিক জাগরণের সূচনা হতে পারে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদকে ঘিরেই।

 

মো. বোরহান উদ্দিন

উদ্যোক্তা, সমাজ-গণমাধ্যম কর্মী ও কলাম লেখক

ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

ইউনিয়ন পরিষদকেন্দ্রিক মফস্বলের ব্যবসা-বাণিজ্য

সম্ভাবনার দুয়ার খুলুক গ্রামীণ অর্থনীতিতে

আপডেট সময় ০৫:০৩:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি শুধু বড় বড় শহর, শিল্পাঞ্চল কিংবা রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম, হাটবাজার ও ইউনিয়ন পরিষদকেন্দ্রিক জনপদেও গড়ে উঠেছে অর্থনীতির এক বিশাল সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। অথচ এই সম্ভাবনার অনেকটাই এখনো রয়ে গেছে অব্যবহৃত। পরিকল্পিত উদ্যোগ, সরকারি সহযোগিতা এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে ইউনিয়ন পরিষদকেন্দ্রিক মফস্বল এলাকাগুলো হয়ে উঠতে পারে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি।

গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তি হাটবাজার
একটি ইউনিয়ন পরিষদকে কেন্দ্র করে সাধারণত গড়ে ওঠে ছোট-বড় বাজার, সাপ্তাহিক হাট, মুদি দোকান, কৃষিপণ্যের আড়ত, মাছ-মাংসের ব্যবসা, কাপড়ের দোকান, ফার্মেসি, কৃষি উপকরণের দোকানসহ নানা ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকেন হাজারো মানুষ।

কৃষক তাঁর উৎপাদিত ধান, সবজি, ফলমূল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে বিক্রি করেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সেই পণ্য সংগ্রহ করে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেন। পরিবহন শ্রমিক, দোকান কর্মচারী, দিনমজুর, আড়তদার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ। অর্থাৎ একটি ইউনিয়ন বাজার সচল থাকলে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসে।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা
মফস্বল এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তুলনামূলক কম পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ। একজন তরুণ চাইলে অনলাইনভিত্তিক পণ্য বিক্রি, কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ, দুগ্ধ খামার, পোলট্রি, মৎস্য চাষ, কৃষি যন্ত্রপাতি ভাড়া কিংবা ক্ষুদ্র উৎপাদনমুখী শিল্প গড়ে তুলতে পারেন।

বিশেষ করে বর্তমান ডিজিটাল যুগে গ্রামে বসেও শহর ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। প্রয়োজন শুধু প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজারসংযোগ।

উন্নয়নের পথে যেসব বাধা
সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ইউনিয়ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। অনেক বাজারে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। উন্নত সড়ক যোগাযোগ, পণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা, গুদাম, আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ পরিবেশের অভাব রয়েছে।

এ ছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সহজে ব্যাংকঋণ পান না। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনার আধুনিক কৌশল সম্পর্কে জানেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার সমস্যাও গ্রামীণ অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করে।

ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ
ইউনিয়ন পরিষদ শুধু নাগরিক সনদ, জন্মনিবন্ধন কিংবা স্থানীয় প্রশাসনিক সেবার কেন্দ্র নয়; এটি স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হতে পারে।

প্রতিটি ইউনিয়নের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা চিহ্নিত করে একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। স্থানীয় হাটবাজারের অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবসায়ীদের নিবন্ধন ও তথ্যভান্ডার তৈরি, তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, কৃষিপণ্য বিপণনে সহযোগিতা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।

পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে নারীদের কর্মসংস্থান ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে।

মফস্বলেই তৈরি হোক কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র
প্রতিবছর অসংখ্য তরুণ কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন। অথচ তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে শহরের ওপর চাপ কমবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।

স্থানীয়ভাবে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য উৎপাদন, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র কারখানা, অনলাইন ব্যবসা এবং পরিবহনসেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। এজন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনিয়ন পরিষদ ভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা ও অসুবিধা: বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইউনিয়ন পরিষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। ইউনিয়ন পরিষদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ এবং সেবা খাত গড়ে উঠতে পারে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয় এবং মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

ইউনিয়ন পরিষদ ভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা

ক) স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি: ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠলে এলাকার বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

খ) স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন: ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের ফলে এলাকার মানুষের আয় বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।

গ)  সহজে ব্যবসা পরিচালনা: স্থানীয় পর্যায়ে ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকে।

ঘ) কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ: কৃষকরা উৎপাদিত ফসল, মাছ, দুধ, শাকসবজি ও অন্যান্য পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে পারেন।

ঙ) যোগাযোগ ও পরিবহন সুবিধা: ইউনিয়ন পর্যায়ে বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে স্থানীয় যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে।

চ) নারী উদ্যোক্তা তৈরি: নারীরা হাঁস-মুরগি পালন, হস্তশিল্প, সেলাই, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারেন।

ছ) স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার: এলাকার জমি, শ্রম, কাঁচামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে নতুন ব্যবসা গড়ে তোলা যায়।

জ) দারিদ্র্য বিমোচন: ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পায়।

ঝ) স্থানীয় বাজারের সম্প্রসারণ: নতুন দোকান, হাট-বাজার, কৃষিপণ্য সংগ্রহ কেন্দ্র ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

ঞ) সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমে সহায়তা: ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবসায়িক অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়।

ইউনিয়ন পরিষদ ভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের অসুবিধা

ক) অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা: অনেক এলাকায় ভালো রাস্তা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও ইন্টারনেটের অভাব রয়েছে।

খ) মূলধনের অভাব: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সহজে ব্যাংকঋণ বা পর্যাপ্ত বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে পারেন না।

গ) প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব: অনেক ব্যবসায়ী আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল মার্কেটিং ও অনলাইন ব্যবসা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না।

ঘ) বাজারের সীমাবদ্ধতা: গ্রামীণ এলাকায় ক্রেতার সংখ্যা ও ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় ব্যবসার প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়।

ঙ) দক্ষ জনবলের অভাব: প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ কর্মীর অভাবে ব্যবসার উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে।

চ) প্রশাসনিক জটিলতা: বিভিন্ন সরকারি অনুমোদন, লাইসেন্স ও কাগজপত্র সংগ্রহে সময় ও অর্থ ব্যয় হতে পারে।

ছ) পণ্য সংরক্ষণের সমস্যা: হিমাগার, গুদাম ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

জ) পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি: প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ হয়।

ঝ)প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি: বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও অতিবৃষ্টির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ঞ) বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা: গ্রামীণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বড় কোম্পানি ও শহরকেন্দ্রিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।

ইউনিয়ন পরিষদভিত্তিক সম্ভাবনাময় ব্যবসার ক্ষেত্র

কৃষিভিত্তিক ব্যবসাধান, সবজি, ফল ও কৃষিপণ্য
কৃষিভিত্তিক ব্যবসা: ধান, সবজি, ফল ও কৃষিপণ্য

পোলট্রি ও মৎস্য: মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি পালন

কুটির শিল্প: হস্তশিল্প, সেলাই ও তাঁতশিল্প

স্থানীয় বাজার: মুদি দোকান, ফার্মেসি ও কৃষি উপকরণ

ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে করণীয়

ক) ইউনিয়ন পর্যায়ে আধুনিক হাট-বাজার ও ব্যবসায়িক অবকাঠামো গড়ে তোলা।

খ) ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা।

গ) নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

ঘ) ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রশাসনিক সেবা সহজ করা।

ঙ) কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার ও গুদাম নির্মাণ করা।

চ) ডিজিটাল মার্কেটিং ও ই-কমার্স সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া।

ছ) সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।

ইউনিয়ন পরিষদভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। তবে মূলধনের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও বাজারজাতকরণের সমস্যার কারণে এ খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তাই ইউনিয়ন পরিষদ, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিটি ইউনিয়ন একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু রাজধানী কিংবা জেলা শহরের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। উন্নয়নের আলো পৌঁছে দিতে হবে প্রতিটি ইউনিয়ন, প্রতিটি গ্রাম এবং প্রতিটি হাটবাজারে।

ইউনিয়ন পরিষদকে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করতে হবে এবং গ্রামীণ বাজারব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, একটি ইউনিয়নের বাজার যত সমৃদ্ধ হবে, সেই ইউনিয়নের মানুষের জীবনযাত্রার মান তত উন্নত হবে। আর হাজার হাজার ইউনিয়নের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই একদিন গড়ে তুলবে একটি শক্তিশালী, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

গ্রামের অর্থনীতি বাঁচলে দেশের অর্থনীতি এগোবে—আর সেই অর্থনৈতিক জাগরণের সূচনা হতে পারে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদকে ঘিরেই।

 

মো. বোরহান উদ্দিন

উদ্যোক্তা, সমাজ-গণমাধ্যম কর্মী ও কলাম লেখক