০৭:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৯ মে ২০২৬

ইইউ-ভারত বাণিজ্য চুক্তি: বাংলাদেশের পোশাক খাতে নতুন শঙ্কা

ফারজানা বিনতে হোসাইন - স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
  • আপডেট সময় ০৫:০৬:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬
  • / ৫ বার পড়া হয়েছে

ছবি সংগৃহীত

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান বাজার। মূলত জিএসপি (জেনারেল সিস্টেম অব প্রেফারেন্স) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের কারণেই ইউরোপের এই বিশাল বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য ধরে রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ।

কিন্তু ২০২৯ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর এই শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা আর থাকবে না। এমন এক ক্রান্তিলগ্নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে প্রতিবেশী দেশ ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের ঘটনা বাংলাদেশের পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের এই এফটিএ’র ফলে বৈশ্বিক ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারতের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন। এই সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশেরও এফটিএ’র আলোচনা শুরু করা এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সংকট সমাধানের বিকল্প নেই।

ভারত-ইইউ চুক্তির প্রভাব ও শঙ্কা

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ভারতের সম্পন্ন হওয়া এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটিকে বাণিজ্য বিশ্লেষকরা ‘মাদার অব অল ডিলস’ বা ঐতিহাসিক চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। এই চুক্তির ফলে দুই দেশ ও অঞ্চলের ৯৯ শতাংশেরও বেশি পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেওয়া হবে।

এর আওতায় ভারত ইইউর ৯১ শতাংশ পণ্য এবং ইইউ ভারতের প্রায় ৯৬.৬ শতাংশ পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করবে। এতে করে দুই অঞ্চলের বাণিজ্য ব্যাপকভাবে প্রসারিত হবে।

এই চুক্তির ফলে ভারতের তৈরি পোশাক, চামড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের রপ্তানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে ইউরোপীয় গাড়ি, ওয়াইন এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম ভারতে কমে আসবে। বস্ত্রশিল্পে এই চুক্তি ভারতের জন্য এক বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভারত এখন ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে বড় শেয়ার দখলের সুযোগ পেয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে আলোচনা শেষে চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে এই চুক্তি সই হয়। যা আগামী বছর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ ইইউতে জিএসপি সুবিধা পেলেও ভারতকে নির্দিষ্ট হারে শুল্ক দিয়ে পোশাক রপ্তানি করতে হতো। কিন্তু এই চুক্তির ফলে ভারতকে আর শুল্ক দিতে হবে না। উপরন্তু, ভারতের নিজস্ব বিশাল তুলার মজুত ও শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ রয়েছে। কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং ইইউতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার—এই দুইয়ের সমন্বয়ে ভারত ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের হিস্যায় বড় ধরনের ভাগ বসাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অর্ডার শিফট হচ্ছে ভারতে, ক্রেতাদের মধ্যে পূর্বপ্রস্তুতি

ভারত শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার খবরে ইউরোপের বায়ার বা ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে। দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের ব্যবসার নিরাপত্তা ও শুল্কমুক্ত সুবিধার আশায় তারা ইতোমধ্যেই ভারতে যেতে শুরু করেছেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম একটি উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরে বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার কাছে তথ্য আছে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএম তাদের অর্ডারগুলো বাংলাদেশ থেকে শিফট করছে। আগামী এক বছরের মধ্যে হয়তো আরও অনেক অর্ডার সেখানে চলে যাবে। আমি এইচঅ্যান্ডএম-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টরের সাথে বৈঠক করেছি। ভারত যেহেতু এফটিএ করে ফেলেছে এবং আমরা এখনও সে ধরনের কোনো কাজ করতে পারিনি, তাই বায়ারদের এই শিফটিংয়ের সম্ভাবনা প্রবল।’

তিনি আরও বলেন,‘গত বছরের আগ পর্যন্ত এইচঅ্যান্ডএম বাংলাদেশে প্রতি বছরই অর্ডার প্লেসিং বাড়িয়েছিল। এই বছরই একমাত্র তারা অর্ডার বাড়ায়নি, বরং কমিয়েছে। অর্ডার কমার পেছনে অন্য কোনো কারণ ঘটেনি, মূল কারণ হলো তারা ভারতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তারা আস্তে আস্তে তাদের রপ্তানি আদেশ ভারতে সরিয়ে নিচ্ছে।’

একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীও।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন বলেন, ‘ইতোমধ্যে কিছু ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে চলে যাচ্ছে। আমরা যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নিই, তবে আগামীতে আরও ক্রেতা চলে যাবে।’

ইউরোপের বাজারে বর্তমান চিত্র: শক্তিশালী অবস্থানে বাংলাদেশ

পরিসংখ্যান বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই (জুলাই-মার্চ) বাংলাদেশ ১৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক ইইউতে রপ্তানি করেছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি ছিল ২৮.৫৮ বিলিয়ন ডলার।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে পোশাক রপ্তানির দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়, যেখানে ভারতের অবস্থান চতুর্থ। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের শেয়ার ভারতের তুলনায় চার গুণেরও বেশি।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে যথাক্রমে ১৮.৩১ ও ১৯.৪১ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে ভারত রপ্তানি করেছে যথাক্রমে ৪.১৮ ও ৪.৫২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক।

এফটিএ সুবিধা পেলেই যে ভারত রাতারাতি বাংলাদেশের বাজার দখল করতে পারবে -এমনটা মনে করেন না বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক সুবিধা আছে। আমরা বিশাল ভলিউমে তৈরি পোশাক তৈরি করতে পারি, আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে এবং আমরা মানসম্পন্ন পোশাক প্রস্তুত করি। বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (কমপ্লায়েন্স) বজায় রেখে যে বিশাল ভলিউমে রপ্তানি করছে, ভারত ইচ্ছা করলেই এত বড় ভলিউমের অর্ডার এখনই নিতে পারবে না। কারণ সেখানে এত বড় সাইজের ফ্যাক্টরি এখনও গড়ে ওঠেনি। তবে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে।’

দ্রুত এফটিএ এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কারের পরামর্শ

এই আসন্ন সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা অত্যাবশ্যক বলে মনে করছেন দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (ইউরোচ্যাম) চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের ক্রান্তিকালে রয়েছে। এ অবস্থায় ইইউর সঙ্গে অবশ্যই বাংলাদেশের একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থাকতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভিয়েতনাম ও ভারত ইতোমধ্যে এ চুক্তি করেছে। বাজার ও বিনিয়োগ ধরে রাখতে বাংলাদেশেরও একই পথে হাঁটতে হবে। সবচেয়ে বড় বাজারে যদি মুক্তবাণিজ্য সুবিধা না থাকে, তাহলে এখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো সুযোগ থাকবে না।’

এখনই অন্তত আলোচনা শুরু করাটা বেশি জরুরি বলে মনে করেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে যত দ্রুত সম্ভব আমাদের একটা এফটিএ করার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্তত বায়ারদের কাছে যদি এই মেসেজটা যায় যে বাংলাদেশ এফটিএ করার উদ্যোগ নিয়েছে, তাহলে তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে এবং তাদের শঙ্কা কাটবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কেই এই মূল উদ্যোগটি নিতে হবে।

এ বিষয়ে বাড়তি সতর্কতার বিষয়টি যোগ করেন বিজিএমইএ সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘ইউরোপ ও ভারতের ব্যবসায়িক সক্ষমতা অনেকটাই সমান্তরাল ও পরিপূরক। টেক্সটাইল শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নিজস্ব কাঁচামালের উৎস নিশ্চিত করা এবং বন্দরসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে ভারত এই চুক্তির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সক্ষমতা এখনও বেশ অসম।’

তিনি বলেন, ‘শুধু চাইলেই কোনো দেশ এফটিএ করতে রাজি হবে না। এটি একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয়। অপর দেশকেও কিছু সুবিধা দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হয়। ভারতের মতো শক্তিশালী বন্দর সুবিধা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নিজস্ব কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে ইইউ আমাদের সঙ্গে এফটিএ করতে আগ্রহী নাও হতে পারে।’

উদ্যোক্তারা বলছেন, ভারত রপ্তানির বিপরীতে নানা ইনসেনটিভ পায়, এমনকি সেখানে শ্রমিকের বেতনের একটি অংশ সরকার বহন করে, যা তাদের রপ্তানিকারকদের বাড়তি সুবিধা দেয়। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমাদের বড় সমস্যা হলো জ্বালানি সংকট। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সমাধান করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের সংকটগুলো দূর করতে হবে, কাস্টমস বা আইন-কানুনের জটিলতা কমাতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি আনতে হবে। সরকার যদি এই কাজগুলো করতে পারে এবং এফটিএর দিকে পরিকল্পিতভাবে এগোয়, তবে ইনশাআল্লাহ কেউ আমাদের বাজার কেড়ে নিতে পারবে না।’

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি দ্রুত প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার সাপোর্ট নিশ্চিত করতে পারে, তবে বাংলাদেশ বায়ারদের ধরে রাখতে সক্ষম হবে। অন্যথায়, ২০২৯ সালের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা হারালে পোশাক শিল্পের এই বিশাল বাজার প্রতিযোগী দেশগুলোর হাতে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

ইইউ-ভারত বাণিজ্য চুক্তি: বাংলাদেশের পোশাক খাতে নতুন শঙ্কা

আপডেট সময় ০৫:০৬:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান বাজার। মূলত জিএসপি (জেনারেল সিস্টেম অব প্রেফারেন্স) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের কারণেই ইউরোপের এই বিশাল বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য ধরে রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ।

কিন্তু ২০২৯ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর এই শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা আর থাকবে না। এমন এক ক্রান্তিলগ্নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে প্রতিবেশী দেশ ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের ঘটনা বাংলাদেশের পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের এই এফটিএ’র ফলে বৈশ্বিক ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারতের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন। এই সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশেরও এফটিএ’র আলোচনা শুরু করা এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সংকট সমাধানের বিকল্প নেই।

ভারত-ইইউ চুক্তির প্রভাব ও শঙ্কা

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ভারতের সম্পন্ন হওয়া এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটিকে বাণিজ্য বিশ্লেষকরা ‘মাদার অব অল ডিলস’ বা ঐতিহাসিক চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। এই চুক্তির ফলে দুই দেশ ও অঞ্চলের ৯৯ শতাংশেরও বেশি পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেওয়া হবে।

এর আওতায় ভারত ইইউর ৯১ শতাংশ পণ্য এবং ইইউ ভারতের প্রায় ৯৬.৬ শতাংশ পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করবে। এতে করে দুই অঞ্চলের বাণিজ্য ব্যাপকভাবে প্রসারিত হবে।

এই চুক্তির ফলে ভারতের তৈরি পোশাক, চামড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের রপ্তানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে ইউরোপীয় গাড়ি, ওয়াইন এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম ভারতে কমে আসবে। বস্ত্রশিল্পে এই চুক্তি ভারতের জন্য এক বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভারত এখন ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে বড় শেয়ার দখলের সুযোগ পেয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে আলোচনা শেষে চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে এই চুক্তি সই হয়। যা আগামী বছর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ ইইউতে জিএসপি সুবিধা পেলেও ভারতকে নির্দিষ্ট হারে শুল্ক দিয়ে পোশাক রপ্তানি করতে হতো। কিন্তু এই চুক্তির ফলে ভারতকে আর শুল্ক দিতে হবে না। উপরন্তু, ভারতের নিজস্ব বিশাল তুলার মজুত ও শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ রয়েছে। কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং ইইউতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার—এই দুইয়ের সমন্বয়ে ভারত ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের হিস্যায় বড় ধরনের ভাগ বসাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অর্ডার শিফট হচ্ছে ভারতে, ক্রেতাদের মধ্যে পূর্বপ্রস্তুতি

ভারত শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার খবরে ইউরোপের বায়ার বা ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে। দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের ব্যবসার নিরাপত্তা ও শুল্কমুক্ত সুবিধার আশায় তারা ইতোমধ্যেই ভারতে যেতে শুরু করেছেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম একটি উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরে বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার কাছে তথ্য আছে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএম তাদের অর্ডারগুলো বাংলাদেশ থেকে শিফট করছে। আগামী এক বছরের মধ্যে হয়তো আরও অনেক অর্ডার সেখানে চলে যাবে। আমি এইচঅ্যান্ডএম-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টরের সাথে বৈঠক করেছি। ভারত যেহেতু এফটিএ করে ফেলেছে এবং আমরা এখনও সে ধরনের কোনো কাজ করতে পারিনি, তাই বায়ারদের এই শিফটিংয়ের সম্ভাবনা প্রবল।’

তিনি আরও বলেন,‘গত বছরের আগ পর্যন্ত এইচঅ্যান্ডএম বাংলাদেশে প্রতি বছরই অর্ডার প্লেসিং বাড়িয়েছিল। এই বছরই একমাত্র তারা অর্ডার বাড়ায়নি, বরং কমিয়েছে। অর্ডার কমার পেছনে অন্য কোনো কারণ ঘটেনি, মূল কারণ হলো তারা ভারতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তারা আস্তে আস্তে তাদের রপ্তানি আদেশ ভারতে সরিয়ে নিচ্ছে।’

একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীও।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন বলেন, ‘ইতোমধ্যে কিছু ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে চলে যাচ্ছে। আমরা যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নিই, তবে আগামীতে আরও ক্রেতা চলে যাবে।’

ইউরোপের বাজারে বর্তমান চিত্র: শক্তিশালী অবস্থানে বাংলাদেশ

পরিসংখ্যান বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই (জুলাই-মার্চ) বাংলাদেশ ১৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক ইইউতে রপ্তানি করেছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি ছিল ২৮.৫৮ বিলিয়ন ডলার।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে পোশাক রপ্তানির দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়, যেখানে ভারতের অবস্থান চতুর্থ। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের শেয়ার ভারতের তুলনায় চার গুণেরও বেশি।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে যথাক্রমে ১৮.৩১ ও ১৯.৪১ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে ভারত রপ্তানি করেছে যথাক্রমে ৪.১৮ ও ৪.৫২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক।

এফটিএ সুবিধা পেলেই যে ভারত রাতারাতি বাংলাদেশের বাজার দখল করতে পারবে -এমনটা মনে করেন না বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক সুবিধা আছে। আমরা বিশাল ভলিউমে তৈরি পোশাক তৈরি করতে পারি, আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে এবং আমরা মানসম্পন্ন পোশাক প্রস্তুত করি। বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (কমপ্লায়েন্স) বজায় রেখে যে বিশাল ভলিউমে রপ্তানি করছে, ভারত ইচ্ছা করলেই এত বড় ভলিউমের অর্ডার এখনই নিতে পারবে না। কারণ সেখানে এত বড় সাইজের ফ্যাক্টরি এখনও গড়ে ওঠেনি। তবে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে।’

দ্রুত এফটিএ এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কারের পরামর্শ

এই আসন্ন সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা অত্যাবশ্যক বলে মনে করছেন দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (ইউরোচ্যাম) চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের ক্রান্তিকালে রয়েছে। এ অবস্থায় ইইউর সঙ্গে অবশ্যই বাংলাদেশের একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থাকতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভিয়েতনাম ও ভারত ইতোমধ্যে এ চুক্তি করেছে। বাজার ও বিনিয়োগ ধরে রাখতে বাংলাদেশেরও একই পথে হাঁটতে হবে। সবচেয়ে বড় বাজারে যদি মুক্তবাণিজ্য সুবিধা না থাকে, তাহলে এখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো সুযোগ থাকবে না।’

এখনই অন্তত আলোচনা শুরু করাটা বেশি জরুরি বলে মনে করেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে যত দ্রুত সম্ভব আমাদের একটা এফটিএ করার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্তত বায়ারদের কাছে যদি এই মেসেজটা যায় যে বাংলাদেশ এফটিএ করার উদ্যোগ নিয়েছে, তাহলে তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে এবং তাদের শঙ্কা কাটবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কেই এই মূল উদ্যোগটি নিতে হবে।

এ বিষয়ে বাড়তি সতর্কতার বিষয়টি যোগ করেন বিজিএমইএ সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘ইউরোপ ও ভারতের ব্যবসায়িক সক্ষমতা অনেকটাই সমান্তরাল ও পরিপূরক। টেক্সটাইল শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নিজস্ব কাঁচামালের উৎস নিশ্চিত করা এবং বন্দরসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে ভারত এই চুক্তির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সক্ষমতা এখনও বেশ অসম।’

তিনি বলেন, ‘শুধু চাইলেই কোনো দেশ এফটিএ করতে রাজি হবে না। এটি একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয়। অপর দেশকেও কিছু সুবিধা দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হয়। ভারতের মতো শক্তিশালী বন্দর সুবিধা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নিজস্ব কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে ইইউ আমাদের সঙ্গে এফটিএ করতে আগ্রহী নাও হতে পারে।’

উদ্যোক্তারা বলছেন, ভারত রপ্তানির বিপরীতে নানা ইনসেনটিভ পায়, এমনকি সেখানে শ্রমিকের বেতনের একটি অংশ সরকার বহন করে, যা তাদের রপ্তানিকারকদের বাড়তি সুবিধা দেয়। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমাদের বড় সমস্যা হলো জ্বালানি সংকট। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সমাধান করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের সংকটগুলো দূর করতে হবে, কাস্টমস বা আইন-কানুনের জটিলতা কমাতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি আনতে হবে। সরকার যদি এই কাজগুলো করতে পারে এবং এফটিএর দিকে পরিকল্পিতভাবে এগোয়, তবে ইনশাআল্লাহ কেউ আমাদের বাজার কেড়ে নিতে পারবে না।’

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি দ্রুত প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার সাপোর্ট নিশ্চিত করতে পারে, তবে বাংলাদেশ বায়ারদের ধরে রাখতে সক্ষম হবে। অন্যথায়, ২০২৯ সালের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা হারালে পোশাক শিল্পের এই বিশাল বাজার প্রতিযোগী দেশগুলোর হাতে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।