প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরে গুরুত্ব পাবে যেসব বিষয়
- আপডেট সময় ০২:৫৯:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
- / ৪ বার পড়া হয়েছে
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের চার মাস পর প্রথমবারের মতো সরকারি বিদেশ সফরে যাচ্ছেন। দুই দিনের সফরে ২১ জুন মালয়েশিয়া যাচ্ছেন তিনি।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে এ সফর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের আমন্ত্রণ এসেছিল ভারত থেকে। ফেব্রুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠান। আমন্ত্রণ ছিল মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের পক্ষ থেকেও।
এর পরে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়েরও আমন্ত্রণপত্র আসে বেইজিং সফরের জন্য। শেষ পর্যন্ত ভারত বা চীন নয়, সরকারপ্রধান হিসেবে নিজের প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন তারেক রহমান। কেন মালয়েশিয়াকেই প্রথম সফর হিসেবে বেছে নিলেন, সফরে কোন বিষয় গুরুত্ব পাবে এসব এখন আলোচনায়। জানা যায়, বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চীনের মধ্যে তীব্র কৌশলগত প্রতিযোগিতা চলছে।
নতুন সরকারের প্রথম সফর হিসেবে দিল্লি বা বেইজিংয়ের যেকোনো একটিকে বেছে নিলে অন্য পক্ষের কাছে ভুল বার্তা যাওয়ার ঝুঁকি থাকত। প্রথম সফরে একটি ‘তৃতীয় রাষ্ট্র’ তথা নিরপেক্ষ বন্ধুরাষ্ট্রকে বেছে নেওয়া হয়েছে। যদিও সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সফরকালে সাধারণ কর্মী নিয়োগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শিক্ষা, সামরিক, অর্থনৈতিক অংশীদারি এবং আঞ্চলিক শান্তির বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। বাংলাদেশে আশ্রয়ে থাকা আসিয়ান সদস্য দেশ মিয়ানমারের নির্যাতিত নাগরিক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং বন্ধ থাকা সাধারণ কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরু করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা বলছেন, আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়ার কৌশলগত অবস্থান বিবেচনায় বিদেশ সফরের প্রথম গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন তারেক রহমান।
কারণ দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্র মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয়; বাণিজ্য, শ্রমবাজার, শিক্ষা, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত।
জানা যায়, সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে শ্রমবাজার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ, হালাল খাদ্যশিল্প, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। সফরের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ২২ জুন দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে কথা চলছে। তারেক রহমানের এ সফর ঘিরে কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। মালয়েশিয়া সফর শেষ করেই ২৩ জুন তাঁর চীনে যাওয়ার কথা রয়েছে। এ জোড়া সফরকে বিদ্যমান ভূরাজনীতিতে তারেক রহমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মালয়েশিয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। প্রথম সফরে সেখানে যাওয়ার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব এবং আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার বার্তা বহন করবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের জট খুললে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থান হবে, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়িয়ে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে বড় ভূমিকা রাখবে। সামগ্রিকভাবে প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে দেশের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত পরিপক্ব ও কৌশলগতভাবে সঠিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার শুধু শ্রমবাজারেই গুরুত্ব দিচ্ছে না, দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে আরও বেশ কিছু ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। এর মাধ্যমে দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্কে নতুন গতি আনতে চায় ঢাকা। এ লক্ষ্যে এবার কুয়ালালামপুরের সঙ্গে বেশ কিছু সমঝোতা স্মারকে সই হচ্ছে। যার মধ্যে সংস্কৃতি, হালাল শিল্পে সহযোগিতা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে কাঠামোগত আলোচনা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং পুলিশ ও নিরাপত্তা খাতে সমন্বয় জোরদারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ঢাকার উচ্চপর্যায়ের এক কূটনৈতিক সূত্র। প্রাপ্ত তথ্যমতে এ সফরে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে না। তবে পুরোনো চুক্তিগুলো নিয়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে কথা হতে পারে। তারেক রহমানের এ সফর বেশ বিস্তৃত। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা হবে। এ ছাড়া সফরকালে কুয়ালালামপুরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় করারও কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
সফরে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী হবে। যার মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান, প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, উপদেষ্টা মাহদী আমিন থাকবেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীসহ আরও কয়েকজন মন্ত্রীও প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হতে পারেন। ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর শেষে সেখান থেকে চীন সফরে যাবেন তারেক রহমান।
সূত্রের তথ্যমতে প্রধানমন্ত্রী চীন সফরের আগে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ২৩ থেকে ২৬ জুন। সফরটি ঘিরেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। চীন সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বেইজিং গেছেন বলে জানা গেছে। ২১ জুন শুরু হওয়া দুই দেশের সফর শেষে তারেক রহমানের ২৬ জুন ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সবাই প্রত্যাশা করছেন। এ সফর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।


















