জাপানে ইসলামের প্রথম ও গৌরবময় স্মারক : কোবে মসজিদ
- আপডেট সময় ০৩:০৫:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
- / ২ বার পড়া হয়েছে
প্রযুক্তি, শিল্পোন্নয়ন ও আধুনিকতার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত জাপান। বৌদ্ধ ও শিন্তো ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাধিক্যের এই দেশে মুসলমানদের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও ইসলামের ইতিহাস সেখানে এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো।
আজকের জাপানে ইসলাম শুধু একটি ধর্মীয় পরিচয় নয়; বরং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সহাবস্থান ও আন্তধর্মীয় সম্প্রীতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জাপানে বর্তমানে লক্ষাধিক মুসলমান বসবাস করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ অভিবাসী হলেও জাপানি বংশোদ্ভূত মুসলমানের সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে। এই মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীক হলো ঐতিহাসিক ‘কোবে মসজিদ’—যা জাপানের প্রথম স্থায়ী মসজিদ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, উনিশ শতকের শেষভাগে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে জাপানের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়তে শুরু করে। পরবর্তীকালে ভারত, তুরস্ক, তাতার ও চীনের মুসলিম ব্যবসায়ী এবং অভিবাসীরা জাপানে বসতি স্থাপন করলে সেখানে ইসলামের পরিচিতি ও প্রসার আরো বিস্তৃত হয়। তাদের উদ্যোগেই কোরআনের অনুবাদ, ইসলামী গ্রন্থ প্রকাশ এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তারপর ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একটি স্থায়ী ইবাদতখানার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলে ১৯২৮ সালে কোবে শহরে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জাপানে বসবাসরত দেশি-বিদেশি মুসলিম ব্যবসায়ী ও সমাজসেবীরা আন্তরিক প্রচেষ্টায় অর্থ সংগ্রহ করেন এবং নির্মাণকাজ শুরু করেন।
দীর্ঘ কয়েক বছরের শ্রম ও পরিকল্পনার পর ১৯৩৫ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হয় কোবে মসজিদের। তুর্কি-অটোমান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মসজিদটি দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ, সুউচ্চ মিনার ও নান্দনিক নকশার কারণে দ্রুতই জাপানে ইসলামী স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শনে পরিণত হয়। ১৯৩৫ সালের ২ আগস্ট, শুক্রবার পবিত্র জুমার নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদটির কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকে এটি শুধু নামাজের স্থানই নয়; বরং ইসলামী শিক্ষা, দাওয়াহ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মিলনকেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
কোবে মসজিদের ইতিহাসকে আরো গৌরবান্বিত করেছে এর অবিশ্বাস্য টিকে থাকার গল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোবে শহর ব্যাপক বিমান হামলার শিকার হলেও মসজিদটি অক্ষত থাকে। আবার ১৯৯৫ সালের ভয়াবহ গ্রেট হানশিন (কোবে) ভূমিকম্পেও আশপাশের বহু ভবন ধ্বংস হলেও এই ঐতিহাসিক মসজিদ দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে এটি মুসলমানদের কাছে শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি ইতিহাসের এক গৌরবময় স্মারক হিসেবেও পরিচিত।
বর্তমানে কোবে মসজিদে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা, ঈদের জামাত, কোরআন শিক্ষা, ইসলাম পরিচিতিমূলক সেমিনার এবং বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলিম পর্যটক ও গবেষকরাও জাপানের ইসলামী ইতিহাসের সাক্ষী হতে এই মসজিদ পরিদর্শন করেন। প্রযুক্তির উৎকর্ষে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়া জাপানের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক কোবে মসজিদ প্রমাণ করে—সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের ইতিহাসে ইসলামও জাপানের একটি অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।




















