জিয়ারতে মদিনার গুরুত্ব ও ফজিলত
- আপডেট সময় ০২:৩৭:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
- / ০ বার পড়া হয়েছে
ইসলামের ইতিহাসে নবীজির শহর মদিনা অত্যন্ত বরকত ও মর্যাদাপূর্ণ একটি স্থান। এই শহরকে মহান আল্লাহ তাআলা প্রিয় নবীর আশ্রয়স্থল হিসেবে নির্বাচিত করেছেন।
মদিনা শহরে আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর জীবনের শেষ ১০ বছর কাটিয়েছেন, এখানেই তিনি ইন্তেকাল করেছেন এবং মসজিদে নববীর পাশেই তাঁর রওজা রয়েছে। জিয়ারতে মদিনা নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রতীক।
মদিনা শহরের গুরুত্ব ও মর্যাদা
মদিনার পূর্ব নাম ‘ইয়াসরিব’। মহানবী (সা.)-এর হিজরতের পর এই নগরীর নাম রাখা হয় মদিনা।
মদিনা অর্থ শহর। পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবা, আহজাব ও মুনাফিকুনে মদিনার নাম চারবার উচ্চারিত হয়েছে।
মদিনার আরো অনেক নাম রয়েছে। ইমাম নুর উদ্দিন সামহুদি তাঁর ‘ওয়াফাউল ওয়াফা’ গ্রন্থে মদিনার ৯৫টি নাম আছে বলে উল্লেখ করেছেন।
মহানবী (সা.) মদিনাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তা যেন অন্যদের কাছে প্রিয় হয়, সে জন্যও দোয়া করতেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি মদিনাকে আমাদের কাছে প্রিয় করে দাও, যেভাবে প্রিয় করেছ মক্কাকে, বরং তার চেয়েও মদিনাকে বেশি প্রিয় করে দাও।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৮৯)
মদিনা একটি উত্তম ও পবিত্র শহর, যাকে আল্লাহর রাসুল (সা.) বরকতময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মহানবী (সা.) মদিনার জন্য দোয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ! মক্কায় যতটুকু বরকত আছে, মদিনায় তার দ্বিগুণ বরকত দাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩৩৯২)
এই পবিত্র নগরীর নিরাপত্তা এবং একে সব অনিষ্ট থেকে রক্ষার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তাআলা গ্রহণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মদিনার প্রবেশপথগুলোতে ফেরেশতারা পাহারা দিয়ে থাকেন। ফলে কিয়ামতের আগে দাজ্জাল ও মহামারি (প্লেগ) মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৮০)
মদিনায় মৃত্যুবরণ করাকে অশেষ মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। এখানে মৃত্যুবরণ করার জন্য ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) দোয়া করতেন। কেননা মদিনায় মৃত্যুবরণকারীর জন্য আল্লাহর রাসুল (সা.) সুপারিশ করবেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) এই শহরে মৃত্যুবরণ করাকে ফজিলতের কারণ উল্লেখ করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মদিনায় মৃত্যুবরণ করতে সক্ষম, সে যেন সেখানেই মৃত্যুবরণ করে। কেননা যে মদিনায় মৃত্যুবরণ করবে আমি তার জন্য সুপারিশ করব।’ (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস : ৩৯১৭)
জিয়ারতে মদিনার গুরুত্ব ও ফজিলত
মদিনা শহরে রয়েছে এমন একটি মসজিদ, যা মহানবী (সা.) তাঁর নিজের হাতে ও শ্রমে নির্মাণ করেছেন। এই মসজিদে বসেই নবীজি (সা.) ইসলামের শিক্ষা প্রচার করেছেন। এই মসজিদের ইমাম ছিলেন আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজেই। মসজিদে নববী এমন একটি পবিত্র স্থান, যেখানে বসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বহু যুদ্ধ ও জিহাদ পরিচালনা করার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। মহানবী (সা.) মদিনায় যে রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন, তার সব কর্মকাণ্ড এই মসজিদের চত্বরে বসেই মহানবী (সা.) পরিচালনা করেছেন। তাই মসজিদে নববী মুসলিম মিল্লাতের জন্য অত্যন্ত আবেগ ও গভীর ভালোবাসার প্রতীক। এই মসজিদকে (অন্য বর্ণনা মতে, মসজিদে কুবাকে) আল্লাহ তাআলা তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে উল্লেখ করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘প্রথম দিন থেকেই যে মসজিদের ভিত স্থাপন করা হয়েছে তাকওয়ার ওপর, সেটাই তোমার সালাতের জন্য বেশি উপযুক্ত।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০৮)
মসজিদে নববীর আরেকটি ফজিলত হলো, এখানে নামাজ পড়ার সওয়াব অন্য মসজিদের তুলনায় অনেক বেশি। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার এ মসজিদে এক সালাত আদায় করা মসজিদে হারাম ছাড়া অন্যান্য মসজিদে এক হাজার সালাত আদায় করার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৯০)
নবী করিম (সা.)-এর রওজা জিয়ারত বা জিয়ারতে মদিনা একটি সুন্নত ও অতি পুণ্যময় কাজ বলে বর্ণিত হয়েছে। মদিনার রওজা জিয়ারতকে নবীজি (সা.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের ফজিলত বলে উল্লেখ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ইরশাদ করেন, ‘যে আমার ওফাতের পর হজ করল, অতঃপর আমার কবর জিয়ারত করতে এলো, সে যেন আমার জীবিত অবস্থায় আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করল।’ (সুনানে বায়হাকি, হাদিস : ৩৮৫৫)
অন্যদিকে নবীজি (সা.)-এর কবর জিয়ারত করার বিশেষ বরকত হলো এর মাধ্যমে রাসুল (সা.)-এর শাফায়াতের সৌভাগ্য লাভ করা। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত করল, তার জন্য আমার সুপারিশ আবশ্যক হয়ে গেল।’ (দারা কুতনি, হাদিস : ১৯৪)
মহানবী (সা.) আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত করবে, সে কিয়ামতের দিন আমার প্রতিবেশী হিসেবে থাকবে, আর সেদিন আমি তার জন্য শাফায়াত করব।’ (বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৩৮৫৬)
মসজিদে নবীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো নবীজির রওজা জিয়ারত। মসজিদের এক কোণে আছে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর রওজা শরিফ। এর পাশেই রয়েছে একটি স্থান যাকে ‘রিয়াজুল জান্নাত’ বা জান্নাতের উদ্যান বলা হয়। এই অংশটি সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ একটি স্থান। এই স্থানটি যে জান্নাতের বাগানসমূহের একটি, এ প্রসঙ্গে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমার ঘর (বর্তমানে নবীজির কবর) ও মিম্বারের মাঝের জায়গা জান্নাতের বাগানগুলোর একটি আর আমার মিম্বার আমার হাউজের ওপর অবস্থিত।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৯৬)
মহানবী (সা.)-এর কাছে এই জায়গাটি খুবই পছন্দনীয় ছিল। তিনি এখানে নামাজ পড়তে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। সাহাবিরাও এই স্থানে নামাজ পড়ার জন্য বিশেষভাবে আগ্রহ পোষণ করতেন। ইয়াজিদ ইবনে আবু উবাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘আমি সালামা ইবনে আকওয়ার সঙ্গে মসজিদে নববীতে যেতাম। তিনি মুসহাফের নিকটবর্তী পিলারের কাছে (রিয়াজুল জান্নাত) নামাজ পড়তেন। আমি একদিন তাঁকে বললাম, আপনাকে দেখি এ পিলারের কাছে নামাজ পড়তে বেশি আগ্রহী। তিনি বললেন, আমি নবীজি (সা.)-কে এ পিলারের কাছে নামাজ পড়তে আগ্রহী দেখেছি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫০৯)
রিয়াজুল জান্নাত জায়গাটি দৈর্ঘ্যে ২২ মিটার ও প্রস্থে ১৫ মিটার। বর্তমানে এই স্থানটি সবুজ-সাদা রঙের কার্পেট দিয়ে মেড়ানো। মসজিদের অন্যান্য জায়গার কার্পেটগুলোর বেশির ভাগ লাল রঙের হওয়ায় রিয়াজুল জান্নাতের স্থানটি আলাদাভাবে সহজেই চেনা যায়। হজ ও উমরার সময় যাঁরা মদিনায় জিয়ারতে যান, তাঁরা অবশ্যই রিয়াজুল জান্নাতে নামাজ পড়ার জন্য পাগলপারা থাকেন। ফলে এখানে সব সময় হাজিদের ভিড় লেগে থাকে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে মদিনার গুরুত্ব, বরকত ও মর্যাদার কথা স্মরণ রাখা এবং নবীজি (সা.)-এর রওজা জিয়ারত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।




















