নিঃশব্দ বিদায় ও নিঃসঙ্গ কান্না
যে চিত্রনাট্য মেসি নিজে লিখতে পারেননি
- আপডেট সময় ০৬:০৪:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
- / ৯ বার পড়া হয়েছে
গত দুই দশক ধরে যিনি বল পায়ে নামলে ম্যাচের গতিপথ বদলে যেত, সেই লিওনেল মেসি মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনালে এক সাধারণ মানুষের মতো অসহায় দাঁড়িয়ে রইলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ০-১ ব্যবধানের হারে হয়তো শেষ হলো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রূপকথার আন্তর্জাতিক অধ্যায়।
৩৯ বছর বয়সে, নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এসে এতদিন যিনি ভাগ্য নির্ধারণ করতেন, তাকেই নীরব দর্শক হয়ে ভাগ্য লেখা দেখতে হলো। পুরো ম্যাচ জুড়ে স্পেন বলের দখল, গতি ও খেলার ছন্দ নিজেদের কব্জায় রেখেছিল।
নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার মূল কৌশলই ছিল প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলে শেষ মুহূর্তে ধাক্কা দেওয়া, কিন্তু মেসিকে স্প্যানিশ ডিফেন্স এতটাই বোতলবন্দি করে রেখেছিল যে তার পক্ষে ম্যাচটি বের করার কোনো উপায় ছিল না। দীর্ঘ ১২০ মিনিট জুড়ে তাকে এক অদ্ভুত অসহায়তার সঙ্গে লড়াই করতে দেখা গেছে।
শরীর হয়তো সায় দিচ্ছিল, মস্তিষ্ক খুঁজছিল সমাধানের পথ; কিন্তু প্রতিপক্ষ তাকে কোনো সুযোগই দেয়নি। দিনশেষে একজন অতিমানবীকেও প্রতিপক্ষের ছকে বন্দী হতে হয়।
মেসির জীবনে যে পরিমাণ ইতিহাস ও নাটকীয়তা জমা হয়েছে, তা অভাবনীয়। ফুটবলের মতো খেলায় ঈশ্বরপ্রদত্ত অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে জন্ম নেওয়া, আর্জেন্টিনায় বেড়ে উঠে দেশের হয়ে ট্রমা ও জাতীয় পরিচয়ের ভার বহন করা, চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়া এবং পরবর্তীতে জাতীয় দলের হয়ে একাধিক ফাইনাল হেরে অভিমান করে অবসর নেওয়; সবটাই তার জীবনকে এক মহাকাব্যে রূপ দিয়েছিল। ২০২১ কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে যে মেসি অর্জুন থেকে পুরাণে পরিণত হয়েছিলেন, ২০২৬-এর ফাইনাল তাকে আবারও মনে করিয়ে দিল যে, প্রতিভাকে ঘষেমেজে ধারালো করা যায়, কিন্তু কেবল চেষ্টা করে লিওনেল মেসি হিসেবে জন্ম নেওয়া যায় না।
এই পরাজয় মেসির জীবনের চিত্রনাট্যে শেষ বাদ পড়া অধ্যায়টি জুড়ে দিল; যেখানে তিনি ‘অসাধারণ’ হতে পারেননি। এটি কোনো শাস্তি বা বার্তা ছিল না, কেবল এক মহান তারকার শারীরিক ও পারিপার্শ্বিক সীমানাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। বহু বছর ধরে যাকে সর্বশক্তিমান মনে হয়েছিল, তার সেই সীমাবদ্ধতা ফুটে ওঠাটাই ছিল ফুটবলের সবচেয়ে বড় বাস্তব চিত্র।
ম্যাচ শেষে মেসি স্তম্ভিত হয়ে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, পরবর্তীতে পরাজিতদের মঞ্চে ওঠার সময় আর নিজেকে সামলাতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেই অশ্রু কি কেবল একটি ট্রফি হারানোর কষ্টে, নাকি নিজের আর কখনো এই মঞ্চে ফিরতে না পারার আশঙ্কায়; তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। মেসি কখনো স্পষ্টভাবে বলেননি যে এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ। ২০৩০ বিশ্বকাপে তার বয়স হবে ৪৩ বছর, যা কোনো সাধারণ ফুটবলারের ক্ষেত্রে অসম্ভব হলেও মেসির নাম যেখানে যুক্ত থাকে, সেখানে এখনই শেষ শব্দটা লিখে ফেলা অনুচিত।
যদি এটিই তার বিদায় ম্যাচ হয়ে থাকে, তবে তা কোনো বড় ঘোষণা, সতীর্থদের কাঁধে উঠে বিদায়ী মার্চ কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হয়নি। এটি ছিল নীরবে এসে নিঃশব্দে ফিরে যাওয়ার মতো। এমনকি গোল উদযাপনের সময়ও অন্য সব তারকা ফুটবলাররা যেখানে ক্যামেরা ও বিজ্ঞাপনী মুদ্রা খোঁজে, মেসি সবসময় দুহাত আকাশে তুলে সতীর্থদের আলিঙ্গনে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছেন। ফুটবল বিশ্ব তাকে এক ‘ঐশ্বরিক সত্তা’ বানিয়েছিল, আর মেসি তার পুরো জীবন কাটিয়ে দিলেন আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো ‘মানব’ হয়ে থাকার চেষ্টায়।
যদি এটিই তার শেষ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা হয়, তবে আর্জেন্টিনা দলের হয়ে তার পরিসংখ্যান এক অবিশ্বাস্য উচ্চতায় শেষ হলো। আলবিসেলেস্তেদের হয়ে ২০৭টি ম্যাচ খেলে ১২৫টি গোল করেছেন তিনি। ঝুলিতে রয়েছে একটি বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা এবং একটি ফিনালিসিমা ট্রফি।
চলতি বিশ্বকাপে নিজের ষষ্ঠ আসর খেলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর রেকর্ড স্পর্শ করেন মেসি। সেই সঙ্গে মিরোস্লাভ ক্লোসেকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা গোলদাতাদের তালিকায় ওপরে উঠলেও, শেষ পর্যন্ত ২৩ গোল করা কিলিয়ান এমবাপ্পের পেছনে দ্বিতীয় স্থান নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করেন তিনি।
৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকার সামনে হয়তো ২০২৮ কোপা আমেরিকা খেলার সম্ভাবনা এখনও বেঁচে আছে, তবে সেটি নির্ভর করবে ইন্টার মায়ামির হয়ে তার শারীরিক ফিটনেস এবং মাঠের ফর্মের ওপর।
পেলের ফুটবল দেখতে পাওয়া যেমন এক প্রজন্মের জন্য গর্বের বিষয় ছিল, তেমনি চলতি প্রজন্ম মাঠে স্বচক্ষে মেসিকে এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হতে দেখেছে। শেষটা যদি পূর্ণতার রূপকথায় নাও হয়, তবে মেটলাইফের সেই ভেজা চোখের নীরবতাই বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিল; দীর্ঘ দুই দশক ধরে কী অবিশ্বাস্য ও অমূল্য এক ফুটবল জাদুকরের যুগে বাস করেছি আমরা!




















