০৬:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

ঢাকা-বেইজিং ১৫ দফা যৌথ ঘোষণা, তিস্তা প্রকল্পে সহায়তা দেবে চীন

ফারজানা বিনতে হোসাইন - স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
  • আপডেট সময় ০৫:১৩:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
  • / ২ বার পড়া হয়েছে

বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) সহায়তা দেবে চীন। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ঘোষিত ১৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্রে এ কথা জানানো হয়েছে।

শুক্রবার (২৬ জুন) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে ১৫ দফা যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করা হয়।

যৌথ ঘোষণার প্রধান বিষয়গুলো হলো-

১. চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৬ সালের ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত চীন সফর করেন। সফরকালে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিত নিউ চ্যাম্পিয়নসের ১৭তম বার্ষিক সভা (সামার দাভোস)-এ অংশগ্রহণ করেন।

সফরের সময় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এসব বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত মতবিনিময় হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যে পৌঁছায় উভয় পক্ষ।
২. উভয় পক্ষ উল্লেখ করে, ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ও চীন ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক আস্থা সুদৃঢ় করেছে, ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্ব জোরদার করেছে এবং ফলপ্রসূ বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা পরিচালনা করেছে।

চীন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় অভিনন্দন জানায় এবং নতুন সরকারের কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে। বাংলাদেশ মনে করে, চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য নতুন উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

উভয় দেশ বিদ্যমান সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারিত্বকে আরও উন্নীত করে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়।

৩. উভয় দেশ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রাখা, শাসনব্যবস্থা বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় বৃদ্ধি এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে কৌশলগত সংলাপের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘২+২ সংলাপ’ চালুর সম্ভাবনা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

৪. উভয় দেশ একে অপরের মৌলিক স্বার্থ ও প্রধান উদ্বেগের বিষয়ে দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশ পুনরায় ‘এক চীন নীতি’র প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। বাংলাদেশ পুনর্ব্যক্ত করে যে, বিশ্বে একটিই চীন রয়েছে, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বেইজিং সরকারই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার।

অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।

৫. বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় উচ্চমানের সহযোগিতা জোরদার এবং আধুনিকায়নের লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় বাড়াবে এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি জনগণের জীবনমান উন্নয়নমূলক ছোট প্রকল্পেও সহায়তা দেবে। এছাড়া শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

৬. বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প, সরবরাহ শৃঙ্খল ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশকে শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দেওয়ার জন্য চীনকে ধন্যবাদ জানানো হয়। বাংলাদেশও চীনা বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

একই সঙ্গে মংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে উভয় দেশ।

৭. সংযোগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, সৌর প্রযুক্তি, দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে নতুন সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনাও অনুসন্ধান করা হবে।

৮. সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানি পরিকল্পনা, জলবিদ্যাগত পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।

চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) সহায়তা দেবে। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে কাজ করবেন। এছাড়া সামুদ্রিক বিষয়েও সহযোগিতা জোরদার করা হবে।

৯. উভয় দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সফর, প্রশিক্ষণ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে পারস্পরিক সম্পৃক্ততা আরও জোরদারে সম্মত হয়েছে।

১০. ২০২৫ সালে চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি এবং ‘চীন-বাংলাদেশ জনগণের মধ্যে বিনিময় বর্ষ’ সফলভাবে উদযাপনের প্রশংসা করা হয়েছে। উভয় দেশ গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, শিক্ষা, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ জোরদারে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। চীন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখবে।

১১. বাংলাদেশ ‘মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ গঠনের ধারণা এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রস্তাবিত বৈশ্বিক উদ্যোগসমূহের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অন্যদিকে, চীন জাতিসংঘসহ বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের বৃহত্তর ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও)-এর অংশীদার হওয়ার বাংলাদেশের আবেদনকে সমর্থন করেছে।

১২. উভয় দেশ জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক শৃঙ্খলা এবং জাতিসংঘ সনদের নীতি ও উদ্দেশ্যের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখা এবং ফ্যাসিবাদ ও সামরিকবাদের পুনরুত্থানের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করার বিষয়ে একমত হয়েছে।

১৩. মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জনগোষ্ঠীর সংকট সমাধানে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। চীনও রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করার পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

১৪. সফরকালে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে।

১৫. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার সফরসঙ্গীরা উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য চীন সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

প্রসঙ্গত, চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুক্রবার বিকেলে বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। এ সফরে তাঁর সঙ্গে ২৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রয়েছে।

এর আগে, ২১ জুন প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে ২২ জুন তিনি চীন সফরে যান।

ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

ঢাকা-বেইজিং ১৫ দফা যৌথ ঘোষণা, তিস্তা প্রকল্পে সহায়তা দেবে চীন

আপডেট সময় ০৫:১৩:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) সহায়তা দেবে চীন। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ঘোষিত ১৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্রে এ কথা জানানো হয়েছে।

শুক্রবার (২৬ জুন) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে ১৫ দফা যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করা হয়।

যৌথ ঘোষণার প্রধান বিষয়গুলো হলো-

১. চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৬ সালের ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত চীন সফর করেন। সফরকালে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিত নিউ চ্যাম্পিয়নসের ১৭তম বার্ষিক সভা (সামার দাভোস)-এ অংশগ্রহণ করেন।

সফরের সময় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এসব বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত মতবিনিময় হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যে পৌঁছায় উভয় পক্ষ।
২. উভয় পক্ষ উল্লেখ করে, ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ও চীন ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক আস্থা সুদৃঢ় করেছে, ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্ব জোরদার করেছে এবং ফলপ্রসূ বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা পরিচালনা করেছে।

চীন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় অভিনন্দন জানায় এবং নতুন সরকারের কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে। বাংলাদেশ মনে করে, চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য নতুন উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

উভয় দেশ বিদ্যমান সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারিত্বকে আরও উন্নীত করে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়।

৩. উভয় দেশ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রাখা, শাসনব্যবস্থা বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় বৃদ্ধি এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে কৌশলগত সংলাপের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘২+২ সংলাপ’ চালুর সম্ভাবনা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

৪. উভয় দেশ একে অপরের মৌলিক স্বার্থ ও প্রধান উদ্বেগের বিষয়ে দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশ পুনরায় ‘এক চীন নীতি’র প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। বাংলাদেশ পুনর্ব্যক্ত করে যে, বিশ্বে একটিই চীন রয়েছে, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বেইজিং সরকারই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার।

অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।

৫. বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় উচ্চমানের সহযোগিতা জোরদার এবং আধুনিকায়নের লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় বাড়াবে এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি জনগণের জীবনমান উন্নয়নমূলক ছোট প্রকল্পেও সহায়তা দেবে। এছাড়া শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

৬. বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প, সরবরাহ শৃঙ্খল ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশকে শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দেওয়ার জন্য চীনকে ধন্যবাদ জানানো হয়। বাংলাদেশও চীনা বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

একই সঙ্গে মংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে উভয় দেশ।

৭. সংযোগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, সৌর প্রযুক্তি, দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে নতুন সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনাও অনুসন্ধান করা হবে।

৮. সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানি পরিকল্পনা, জলবিদ্যাগত পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।

চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) সহায়তা দেবে। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে কাজ করবেন। এছাড়া সামুদ্রিক বিষয়েও সহযোগিতা জোরদার করা হবে।

৯. উভয় দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সফর, প্রশিক্ষণ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে পারস্পরিক সম্পৃক্ততা আরও জোরদারে সম্মত হয়েছে।

১০. ২০২৫ সালে চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি এবং ‘চীন-বাংলাদেশ জনগণের মধ্যে বিনিময় বর্ষ’ সফলভাবে উদযাপনের প্রশংসা করা হয়েছে। উভয় দেশ গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, শিক্ষা, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ জোরদারে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। চীন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখবে।

১১. বাংলাদেশ ‘মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ গঠনের ধারণা এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রস্তাবিত বৈশ্বিক উদ্যোগসমূহের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অন্যদিকে, চীন জাতিসংঘসহ বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের বৃহত্তর ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও)-এর অংশীদার হওয়ার বাংলাদেশের আবেদনকে সমর্থন করেছে।

১২. উভয় দেশ জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক শৃঙ্খলা এবং জাতিসংঘ সনদের নীতি ও উদ্দেশ্যের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখা এবং ফ্যাসিবাদ ও সামরিকবাদের পুনরুত্থানের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করার বিষয়ে একমত হয়েছে।

১৩. মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জনগোষ্ঠীর সংকট সমাধানে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। চীনও রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করার পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

১৪. সফরকালে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে।

১৫. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার সফরসঙ্গীরা উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য চীন সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

প্রসঙ্গত, চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুক্রবার বিকেলে বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। এ সফরে তাঁর সঙ্গে ২৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রয়েছে।

এর আগে, ২১ জুন প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে ২২ জুন তিনি চীন সফরে যান।